‘বি নেটওয়ার্ক’ বদলে দিচ্ছে যুক্তরাজ্যের গণপরিবহন

বার্নহামের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো ‘বি নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠা- রয়টার্স
যুক্তরাজ্যের পরিবহন খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল আগেই। এর মধ্যেই গ্রেটার ম্যানচেস্টারে অ্যান্ডি বার্নহামের গড়ে তোলা ‘বি নেটওয়ার্ক’ এখন জাতীয় সংস্কারের মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে বার্নহাম ভবিষ্যতের পরিবহননীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। তার মতে, পরিবহন ব্যবস্থা পুনরায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও জনপর্যবেক্ষণের আওতায় আনলে মুনাফার পরিবর্তে আরও যাত্রীকেন্দ্রিক ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
বার্নহামের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো ‘বি নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠা। এটি একটি সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা, যেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাসসেবা, গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেট্রোলিংক ট্রাম এবং ভবিষ্যতে স্থানীয় রেলসেবা নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হচ্ছে। লন্ডনের ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল) মডেল অনুসরণে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্কে অভিন্ন ব্র্যান্ডিং, সহজ ভাড়া কাঠামো, কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট, এক ঘণ্টার মধ্যে অতিরিক্ত ভাড়া ছাড়াই ‘হপার ফেয়ার’, রাতের বাস এবং তরুণদের জন্য ছাড়ের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। গত তিন বছরে বাসযাত্রীর সংখ্যা ২৪ শতাংশ বেড়ে ২০২৬ সালে ১৭ কোটি ৮০ লাখে পৌঁছেছে।
বি নেটওয়ার্ক অবসান ঘটিয়েছে কয়েক দশকের বাস বেসরকারিকরণ নীতির। সেই ব্যবস্থায় বেসরকারি অপারেটররা শুধু লাভজনক রুট পরিচালনা করত। সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় রুটে ভর্তুকি দিত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। বার্নহামের মতে, ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা জনজবাবদিহি ফিরিয়ে এনেছে। ফলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এখন রুট, ভাড়া ও সেবার মান ঠিক করতে পারছে। যদিও বাসগুলো এখনো বেসরকারি কোম্পানিগুলো পরিচালনা করছে, তবে স্বাধীনভাবে নয়। ট্রান্সপোর্ট ফর গ্রেটার ম্যানচেস্টারের নির্ধারিত চুক্তির আওতায় সেবা দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনে বড় অংকের বিনিয়োগ লেগেছে। নতুন ব্যবস্থা চালু করতে এবং বাস ডিপোগুলো পুনরায় কিনে নিতে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভাড়া থেকে পাওয়া আয় পরিচালন ব্যয়ের মাত্র অর্ধেক মিটিয়েছে। এ সময়ে বাস থেকে আয় হয়েছে ২৬ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড এবং ট্রাম থেকে ৮ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড। অন্যদিকে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মিলিত অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৩৭ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড। তবে বার্নহামের দাবি, পুনর্নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থায় এখন প্রতি কিলোমিটার পরিচালন ব্যয় আগের বেসরকারিকরণ মডেলের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম।
এদিকে রেলসেবাও ধীরে ধীরে ফিরছে সরকারি মালিকানায়। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ অধিকাংশ যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নেটওয়ার্ক রেলের সঙ্গে একীভূত হয়ে নতুন ‘গ্রেট ব্রিটিশ রেলওয়েজ’ (জিবিআর)-এর অধীনে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সংস্কারের লক্ষ্য খণ্ডিত ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা তুলে দিয়ে রেললাইন ও ট্রেন পরিচালনা একীভূত করা, জবাবদিহি বাড়ানো, টিকিটব্যবস্থা সহজ করা এবং যাত্রীবান্ধব রেলসেবা গড়ে তোলা। রেলমন্ত্রী লর্ড পিটার হেন্ডির ভাষ্য, নতুন কাঠামো দীর্ঘদিনের চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার তুলনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আরও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করবে।
যদিও পরিবহন খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পক্ষে ব্যাপক সমর্থন আছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাফল্য সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হলে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। লিডস, বার্মিংহাম ও ব্রিস্টলের মতো শহর, পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকাগুলোয় একই মানের সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে লাগবে উল্লেখযোগ্য অর্থায়ন। তবু বার্নহামের বিশ্বাস, বি নেটওয়ার্ক ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে সরকারি নির্দেশনায় পরিচালিত পরিবহনব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি ঘটাতে। বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে পুনরায় সংযুক্ত করতে। এছাড়া জরুরি জনসেবার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতেও সক্ষম হয়েছে বি নেটওয়ার্ক।





