আমেরিকার ছায়া, রাশিয়ার হুমকির মাঝে ইউরোপের দিকে ঝুঁকছে ব্রিটেন?
- ‘আরও সাহসী হতে হবে’, ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার বার্তা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর

ব্রেক্সিটের পর যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে, তা কমানোর পথে আরও এক ধাপ এগোতে চাইছে লন্ডন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে ব্রিটেনকে “আরও সাহসী” হতে হবে। নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দফতর জানিয়েছে, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও কোস্তার সঙ্গে বৈঠকে বার্নহ্যাম এই মন্তব্য করেছেন। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফরে যাওয়ার পথে রবিবার রাতে দুই নেতার মধ্যে ওই আলোচনা হয়। ইউক্রেনকে সমর্থনকারী দেশগুলোর জোট ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর বৈঠকে যোগ দিতে কিয়েভ যাচ্ছিলেন বার্নহ্যাম।
বৈঠকে বার্নহ্যাম বলেছেন, ব্রিটেনের উচিত ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আরও বিস্তৃত সম্পর্ক তৈরি করা। তাঁর মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে লন্ডন ও ইইউর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ব্রেক্সিটের পর সম্পর্ক ফেরানোর চেষ্টা
২০১৬ সালের গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটেন। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে ইইউ থেকে বেরিয়ে যায় দেশটি। এরপর বাণিজ্য, অভিবাসন, শিক্ষার্থী বিনিময় এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে দুই পক্ষের সম্পর্কে নানা টানাপোড়েন তৈরি হয়।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
বার্নহ্যামের মন্তব্য সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। যদিও তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফেরার কোনও পরিকল্পনার কথা বলেননি, তবে ব্রেক্সিটের পর তৈরি হওয়া দূরত্ব কমিয়ে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
কিয়েভ সফরেই ইউরোপকে নতুন বার্তা
বার্নহ্যামের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন তিনি ইউক্রেন সফরে গিয়ে ব্রিটেনের সামরিক ও কূটনৈতিক ভূমিকা আরও জোরালো করার চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। কিয়েভে তিনি ইউক্রেনের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াতে ব্রিটিশ সহায়তার ঘোষণাও দিয়েছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধই বর্তমানে ইউরোপীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান প্রশ্ন। ব্রিটেন মনে করছে, রাশিয়ার আগ্রাসনের মোকাবিলায় ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রয়োজন।
বার্নহ্যামের সঙ্গে কোস্তার আলোচনাতেও নিরাপত্তা সহযোগিতা গুরুত্ব পেয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোতে ব্রিটেনের ভূমিকা আরও সক্রিয় হওয়া উচিত।
বাণিজ্য ও শিক্ষাতেও বাড়ছে আলোচনা
শুধু প্রতিরক্ষা নয়, ব্রিটেন-ইইউ সম্পর্কের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হল বাণিজ্য। ব্রেক্সিটের পর দুই পক্ষের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সহজ করার চেষ্টা চলছে। খাদ্যপণ্য, শিল্প, কার্বন বাজার এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ক্ষেত্রে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ইউরোপীয় তরুণদের জন্য ব্রিটেনে পড়াশোনা ও কাজের সুযোগ বাড়ানো নিয়েও আলোচনা চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাইছে যুব বিনিময় কর্মসূচি আরও বড় করা হোক এবং ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি কাঠামো নিয়েও নতুন সমঝোতা তৈরি হোক।
তবে এই বিষয়গুলো রাজনৈতিক ভাবে সংবেদনশীল। ব্রিটেনে এখনও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চাপ রয়েছে। ফলে ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্যও বজায় রাখতে হচ্ছে বার্নহ্যাম সরকারকে।
আমেরিকা ও রাশিয়ার মাঝে নতুন হিসাব
আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিও ব্রিটেনের ইউরোপমুখী অবস্থানের পেছনে কাজ করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলির নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিটেনের জন্য চ্যালেঞ্জ হল একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে ইউরোপের সঙ্গে নতুন করে কৌশজলগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা।
বার্নহ্যামের বার্তা সেই ভারসাম্যেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে যাওয়ার কথা না বললেও বুঝিয়ে দিয়েছেন, ব্রেক্সিট-পরবর্তী বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে এসে লন্ডন এখন সহযোগিতার নতুন পথ খুঁজছে।
ব্রেক্সিটের এক দশক পর ব্রিটেনের সামনে এখন নতুন প্রশ্ন, ইউরোপ থেকে দূরে থেকে বিশ্বে নিজের অবস্থান শক্ত করবে, নাকি ইউরোপের সঙ্গে হাত মিলিয়েই নতুন বাস্তবতার মোকাবিলা করবে? বার্নহ্যামের বার্তা বলছে, দ্বিতীয় পথেই আপাতত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে লন্ডন।






