ইউরোপ কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনা সরিয়ে নিচ্ছে?

সম্প্রতি নেদারল্যান্ডস যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় রাখা স্বর্ণের একটি বড় অংশ লন্ডনে স্থানান্তর করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও তাদের সোনার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার কৌশল বদলাচ্ছে। সম্প্রতি নেদারল্যান্ডস যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় রাখা স্বর্ণের একটি বড় অংশ লন্ডনে স্থানান্তর করেছে। এর আগে জার্মানি ও ফ্রান্স বিদেশে রাখা সোনার অংশ দেশে বা অন্যত্র সরিয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় রাখা প্রায় ৩১৩ টন সোনার মধ্যে প্রায় ৮৬ টন লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সংকটের সময় যাতে সোনা সহজে ও দ্রুত ব্যবহার করা যায়, সেজন্য এই সিদ্ধান্ত।
এই পদক্ষেপের পর প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট?
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বিষয়টি সরাসরি আস্থাহীনতার চেয়ে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার কৌশলগত পরিবর্তনের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। বাণিজ্যযুদ্ধ, সামরিক সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বয়িক বাজারের অস্থিরতার কারণে বিভিন্ন দেশ এখন তাদের রিজার্ভ এমন কোথাও রাখতে চাইছে, যেখান থেকে প্রয়োজনের সময় দ্রুত তা ব্যবহার করা যায়।
ইউরোপে এ প্রবণতা নতুন নয়; জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েক বছর আগে বিদেশে রাখা ২১৬ টনের বেশি সোনা স্থানান্তর করে। এর মধ্যে ১১১ টন নিউ ইয়র্ক এবং ১০৫ টন প্যারিস থেকে সরানো হয়েছিল। ফ্রান্সও যুক্তরাষ্ট্রে রাখা সোনার একটি অংশ দেশে ফিরিয়ে এনেছে।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় পরিস্থিতি ঠিক এর উল্টো ছিল। নিরাপত্তার কারণে ইউরোপের কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তখন তাদের সোনার একটা অংশ নিউ ইয়র্কে রেখেছিল। এখন পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই হিসাব নতুন করে করা হচ্ছে।
নেদারল্যান্ডসের স্থানান্তর করা স্বর্ণের বড় অংশ ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা হয়েছে। লন্ডন বিশ্বের অন্যতম প্রধান সোনা বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সংকটের সময় সেখানে সোনা দ্রুত বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা বা অন্য সম্পদে রূপান্তর করা তুলনামূলক সহজ। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সোনা সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান। তবে নেদারল্যান্ডস নিউ ইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ বিক্রি করে লন্ডনে সমপরিমাণ সোনা কিনেছে। ফলে ওই অংশ আটলান্টিক পাড়ি দিতে হয়নি। কিন্তু ২৭ টনের বেশি সোনা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে নেদারল্যান্ডসে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার আরেকটি কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রমবর্ধমান সোনা কেনা। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বার্ষিক সোনা কেনার পরিমাণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি, সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ ও বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে সোনাকে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা স্থানান্তরকে বড় ধরনের সংকটের পূর্বাভাসের চেয়ে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার পরিবর্তিত কৌশল বলা যায়।
বিশ্বে এখন কার কত সোনা আছে প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো কোথায় রাখা হচ্ছে, কত দ্রুত ব্যবহার করা যাবে এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে তা কতটা নিরাপদ— এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি নিউজ



