অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে ইইউ দূতের বার্তা
বিট্রেন ফিরতে চাইলে আলোচনায় প্রস্তুত ইইউ

দরজা বন্ধ নয়, কিন্তু হাতলটি এখন লন্ডনের হাতে। ব্রেক্সিটের এক দশক পর ব্রিটেন যখন ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নতুন করে ভাবছে, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে এল স্পষ্ট বার্তা। যুক্তরাজ্য আগে ঠিক করুক, তারা কতটা কাছে যেতে চায়। তারপর আলোচনা করতে প্রস্তুত ইইউ। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ব্রেক্সিট-পরবর্তী নতুন নীতির সামনে এই বক্তব্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক ইঙ্গিত।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যে ইইউর নতুন রাষ্ট্রদূত জুক্কা সালোভারা বলেছেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে “বল এখন অনেকটাই যুক্তরাজ্যের কোর্টে”। ব্রিটেন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বিকল্প ঠিক করার পর ইইউ “আলোচনায় প্রস্তুত” থাকবে। তার ভাষায়, আগের পদ্ধতি ছিল ধাপে ধাপে এগোনো, কিন্তু নতুন প্রধানমন্ত্রী এখন “সব বিকল্প মূল্যায়ন করতে চান”।
বার্নহ্যাম ইতিমধ্যেই বলেছেন, বর্তমান ব্রেক্সিট ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না এবং শুল্ক ইউনিয়ন, একক বাজার থেকে পূর্ণ সদস্যপদে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত সব পথ পর্যালোচনা করা উচিত। তবে এখনই নতুন গণভোটের ঘোষণা দেননি তিনি। নভেম্বরের শেষ দিকে নির্ধারিত যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ বৈঠকের সময় ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সম্ভাব্য পথগুলো দেশের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
৫৮ বছর বয়সী ফিনিশ কূটনীতিক সালোভারা গত ১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যে ইইউ রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নেন। তিন দশকেরও বেশি কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সালোভারা নব্বইয়ের দশকের ‘কুল ব্রিটানিয়া’ সময়েও লন্ডনে ফিনিশ দূতাবাসে কাজ করেছেন। পরে তিনি জাতিসংঘে ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত এবং দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ছিলেন। নিজের বর্তমান ভূমিকাকে তিনি দুই পক্ষের মধ্যে একজন “সহায়ক” হিসেবে দেখছেন৷ আনুষ্ঠানিক আলোচনার টেবিলে না থাকলেও আলোচনার “খুব কাছেই” থাকবেন বলে জানিয়েছেন। প্রসঙ্গত, ‘কুল ব্রিটানিয়া’ ছিল ১৯৯০-এর দশকে ব্রিটেনের সংস্কৃতি, সংগীত, ফ্যাশন ও সৃজনশীল শিল্পের নতুন উত্থানকে বোঝাতে ব্যবহৃত একটি জনপ্রিয় শব্দবন্ধ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ‘নিউ লেবার’ যুগে আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী ও সংস্কৃতিমুখী ব্রিটেনের প্রতীক হিসেবেও এটি পরিচিতি পায়।
ব্রিটেনকে সালোভারো এখনও ইইউর “প্রথম ও প্রধান অংশীদার” বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, লন্ডন ও ইইউ যখন সমঝোতায় পৌঁছেছে, তখন তা দুই পক্ষেরই লাভ হয়েছে। তাঁর দপ্তরের ভাষায়, ২০২৫ সালের কৌশলগত অংশীদারত্বের পর যুক্তরাজ্য ও ইইউ ইতিমধ্যে বাণিজ্য, কৃষিপণ্য, কার্বন বাজার, বিদ্যুৎ, তরুণদের সুযোগ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর পথে রয়েছে।
নভেম্বরের আসন্ন শীর্ষ বৈঠকেও কয়েকটি বাস্তব চুক্তি সামনে থাকতে পারে। খাদ্যমানের নিয়ম কাছাকাছি এনে সীমান্তে পরীক্ষা কমানো, যুক্তরাজ্য ও ইইউর কার্বন নিঃসরণ বাণিজ্যব্যবস্থা যুক্ত করা, যুব বিনিময় এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে। সালোভারা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ব্রিটেনের প্রায় ৬০ শতাংশ খাদ্য রপ্তানি যায় ইইউতে, আর দেশটির খাদ্য আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ আসে ইইউ থেকে। একই মানদণ্ড থাকলে সীমান্তের কাগজপত্র ও পরীক্ষা ব্যাপকভাবে কমতে পারে।
সবচেয়ে কঠিন দরকষাকষির একটি তরুণদের চলাচল নিয়ে। গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের জন্য প্রস্তাবিত ‘ইয়ুথ এক্সপেরিয়েন্স’ কর্মসূচিতে ব্রিটেন বছরে প্রায় ৫০ হাজার জায়গা দিতে চায়, ইইউ চাইছে প্রায় দেড় লাখ। কাজ ও পড়াশোনার অধিকার কতটা থাকবে, সেটিও এখনও আলোচনাধীন।
আর পূর্ণ সদস্যপদ? সালোভারা সেই দরজাও বন্ধ করেননি। তবে তাঁর মতে, এত মৌলিক পরিবর্তনের জন্য ব্রিটেনে শক্তিশালী রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। সেটি নতুন গণভোটে প্রমাণ করতে হবে কি না, সিদ্ধান্ত ব্রিটেনেরই। একক বাজার, শুল্ক ইউনিয়ন কিংবা কানাডার জন্য আলোচিত নতুন ধরনের ‘সহযোগী সদস্যপদ’ও সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে।
ব্রেক্সিটের পর এতদিন প্রশ্ন ছিল, ইইউ ব্রিটেনকে কতটা কাছে আসতে দেবে। নতুন বার্তায় সমীকরণটি যেন উল্টে গেছে। ইউরোপ বলেছে, তারা অপেক্ষা করছে। এখন লন্ডনকেই বলতে হবে, বিচ্ছেদের দশ বছর পর সে আসলে ইউরোপ থেকে কতটা দূরে থাকতে চায়।



