ব্রেক্সিটের পর নতুন দেয়াল
চীনা গাড়িতে শুল্ক বাড়াতে ব্রিটেনকে চাপ ইইউর
- ব্রেক্সিটের স্বাধীনতা নাকি ইউরোপের বাজার, বার্নহ্যামের সামনে নতুন বাণিজ্য-দ্বিধা; কাস্টমস ইউনিয়নে ফেরার পরামর্শও

ব্রিটেনের এক পাশে সস্তা চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও বিনিয়োগের সুযোগ, অন্য পাশে ইউরোপের বিশাল বাজার।
একটি গাড়ি ব্রিটিশ বন্দরে নামার আগেই তার শুল্ক এখন যেন ব্রেক্সিটের নতুন সীমারেখা এঁকে দিচ্ছে। এক পাশে সস্তা চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও বিনিয়োগের সুযোগ, অন্য পাশে ইউরোপের বিশাল বাজার। মাঝখানে দাঁড়িয়ে লন্ডনকে ইইউর বার্তা, দুই দিক একসঙ্গে খোলা রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ রপ্তানি পণ্যকে প্রস্তাবিত ‘মেড ইন ইউরোপ’ বাধা থেকে বাঁচাতে হলে চীনা গাড়ির ওপর শুল্ক বাড়াতে এবং ইইউর বাণিজ্যনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্য করতে হবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্রিটিশ পণ্যের সমান সুবিধা চেয়ে লন্ডনের তদবিরের জবাবে দুই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইইউর মতে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হবে ইইউ কাস্টমস ইউনিয়নে যোগ দেওয়া।
এক ইইউ কর্মকর্তা বলেছেন, “কাস্টমস ইউনিয়ন ‘মেড ইন ইউরোপ’-এর অধিকাংশ সমস্যাই মিটিয়ে দেবে।” তাঁর মতে, ব্রিটেনের শুল্ক কম থাকলে চীনা পণ্য যুক্তরাজ্য হয়ে ইউরোপীয় বাজারে ঢুকে ইইউর শুল্ক এড়িয়ে যেতে পারে, এই আশঙ্কাই এখন ইউরোপীয় এই জোটের বড় উদ্বেগ। আরেক কর্মকর্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন বোঝাতে বলেছেন, একসময় ইউরোপ ভয় পেত ব্রিটেন ‘টেমসের সিঙ্গাপুর’ হবে, এখন ভয় সেটি চীনা পণ্যের ‘পেছনের দরজা’ হয়ে উঠতে পারে।
বার্নহ্যাম অবশ্য লেবার পার্টির আগের নির্বাচনী ‘রেড লাইন’ বহাল রেখে কাস্টমস ইউনিয়ন বা একক বাজারে ফেরার কথা নাকচ করেছেন। কিন্তু ইইউর চীনা বৈদ্যুতিক গাড়িতে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকিবিরোধী শুল্কের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে ব্রেক্সিট-পরবর্তী স্বাধীন বাণিজ্যনীতির পরিসর সংকুচিত হতে পারে এবং ব্রিটিশ ভোক্তার গাড়ির দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ব্রিটেন ২০২৪ সালে ইইউর সঙ্গে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়িতে শুল্ক আরোপ করেনি। এ বছর চীনা নির্মাতারা ব্রিটেনের নতুন গাড়ির বাজারের প্রায় ১৬ শতাংশ দখল করেছে।
তবে ইস্পাতের ক্ষেত্রে লন্ডন ইতিমধ্যেই ইউরোপের পথে হেঁটেছে। অতিরিক্ত বৈশ্বিক উৎপাদন, যার বড় অংশ চীনকেন্দ্রিক, মোকাবিলায় ব্রিটেন এ বছর ইস্পাতের শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করেছে এবং আমদানি কোটা অর্ধেক করেছে। এখন ব্রিটেন চাইছে তার গাড়ি, রাসায়নিক ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাকে ‘মেড ইন ইউরোপ’ সুবিধার আওতায় রাখা হোক।
নিসানের ইউরোপীয় প্রধান মাসিমিলিয়ানো মেসিনা সতর্ক করেছেন, শুল্কনীতিতে পরিবর্তন না এলে যুক্তরাজ্য চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য ইউরোপে প্রবেশের “করিডর” হয়ে উঠতে পারে। অথচ একই সময়ে ব্রিটিশ সরকার চীনা বিনিয়োগও চাইছে, যার মধ্যে সুন্দরল্যান্ডে নিসানের কারখানায় চীনা গাড়ি নির্মাতা চেরির উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে। রাসায়নিক শিল্পেও একই চাপ তৈরি হয়েছে; সস্তা চীনা আমদানির বিরুদ্ধে ইইউ একাধিক অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা নিয়েছে।
ব্রিটিশ সরকার বলেছে, তারা বাণিজ্য সুরক্ষার সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে এবং দেশের শিল্প ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতেই নেবে, তবে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যে যেন “পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজনিত ক্ষতি” না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় কমিশন ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। রয়টার্সও জানিয়েছে, তারা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেদনের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।



