সমুদ্রের তলায় রুশ হুমকি, উদ্বেগে ব্রিটেন
- উত্তর আটলান্টিকে রুশ ডুবোজাহাজ ঠেকাতে তৎপরতা বাড়ানোর ঘোষণা ব্রিটিশ সামরিক প্রধানের

সমুদ্রের ওপর শান্ত ঢেউ। গভীরে অদৃশ্য বিপদের আশঙ্কা। উত্তর আটলান্টিকের তলদেশে ছড়িয়ে রয়েছে যোগাযোগের তার, জ্বালানির পাইপলাইন। সেই গভীরেই চলাচল করে রুশ ডুবোজাহাজ। কোথায় শেষ নজরদারি, কোথায় শুরু বিপদ, তা বোঝা কঠিন। অথচ এই হুমকি মোকাবিলায় ইউরোপীয় মিত্রদের তুলনায় পিছিয়ে ব্রিটেন। এবার সেই ব্যবধান ঘোচানোর তাগিদ দিলেন দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা।
রবিবার (০৮ নভেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল স্যার রিচার্ড নাইটন বলেছেন, রাশিয়ার হুমকি বোঝা ও মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ‘তাল মেলাতে হবে’।
নাইটনের অভিযোগ, রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুপ্তহত্যা, নাশকতা ও সাইবার হামলার ঘটনা মস্কোর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর মতে, নিজের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এমন বিপজ্জনক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তিনি দেখেননি। বিপদের গুরুত্ব জনগণকে বোঝানোও সরকারের দায়িত্ব।
বিশেষ উদ্বেগ উত্তর আটলান্টিক। সেখানে রুশ ডুবোজাহাজ নৌপরিবহন বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা তার। ঝুঁকিতে রয়েছে সমুদ্রতলের যোগাযোগব্যবস্থা। উত্তর মেরুর কাছাকাছি জলসীমা সুরক্ষিত রাখা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।
তাই ব্রিটেনের নেতৃত্বাধীন দশ দেশের যৌথ অভিযাত্রী বাহিনীর নৌসহযোগিতা আরও জোরদার করতে চান নাইটন। এতে রয়েছে উত্তর ইউরোপ ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো এবং নেদারল্যান্ডস। উত্তর আটলান্টিক, উত্তর মেরু ও বাল্টিক সাগরে যৌথ নজরদারি এবং প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
গত জুলাইয়ে জোটটির দশ সদস্যরাষ্ট্র নৌবাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রমে সম্মত হয়। লক্ষ্য, প্রয়োজনে দ্রুত সম্মিলিত অভিযান পরিচালনা। এটি পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বিকল্প নয়। বরং উত্তর ইউরোপে ন্যাটোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার সহযোগী কাঠামো।
উদ্বেগের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক ঘটনাও। গত এপ্রিলে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি জানিয়েছিলেন, নরওয়ের সহযোগিতায় রাশিয়ার একটি আক্রমণকারী ও দুটি বিশেষায়িত ডুবোজাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে ব্রিটিশ বাহিনী। তাঁর অভিযোগ, এসব নৌযান সমুদ্রতলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে সক্ষম।
গত ২২ অক্টোবর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটিও উত্তরাঞ্চলে ডুবোজাহাজ শনাক্ত ও প্রতিরোধের সক্ষমতায় গুরুতর ঘাটতির কথা জানায়। যুদ্ধ বাধলে এসব দুর্বলতা যোগাযোগ, জ্বালানি সরবরাহ ও আটলান্টিক পেরিয়ে সামরিক সহায়তার পথকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউরোপের নিরাপত্তা ভাবনা বদলেছে। নাইটনের মতে, ওয়াশিংটন বহু আগেই এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মনোযোগ বাড়িয়েছে। ফলে মার্কিন নেতৃত্বে যিনিই থাকুন, ইউরোপকে নিজের প্রতিরক্ষায় বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।
ব্রিটিশ সরকার ২০৩০ সালে মোট দেশজ উৎপাদনের তিন শতাংশ এবং ২০৩৫ সালে সাড়ে তিন শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয়ের লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু অর্থ বাড়ানোই শেষ কথা নয়। সমুদ্রের গভীরে বিপদ সহজে দেখা যায় না। সেই অদৃশ্য হুমকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই প্রস্তুত হতে পারবে কি ব্রিটেন?



