ব্রিটেনে ঘরে ঘরে জল ও টিনজাত খাবার মজুতের পরামর্শ সরকারের

যুদ্ধ নয়, তবু সতর্ক যুক্তরাজ্য
যুদ্ধের আশঙ্কা নয়, কিন্তু একের পর এক নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে নাগরিকদের আরও প্রস্তুত থাকতে বলছে ব্রিটিশ সরকার। রাশিয়ার হুমকি, ইরান-ঘনিষ্ঠ হ্যাকারদের সাইবার হামলা এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ব্রিটেনের নতুন ‘জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা’ পরিকল্পনায় সাধারণ মানুষকে ঘরে জরুরি সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে৷
সরকারের নতুন প্রচার অভিযানে নাগরিকদের বলা হয়েছে, প্রয়োজনে যাতে কয়েক দিন স্বাভাবিক পরিষেবা ব্যাহত হলেও তারা সামলাতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে বোতলজাত জল, টিনজাত খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জরুরি ব্যবহারের সামগ্রী ঘরে রাখা।
ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য আতঙ্ক ছড়ানো নয়; বরং বিদ্যুৎ বিভ্রাট, সাইবার হামলা, বন্যা, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ বা অন্য কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে প্রস্তুত রাখা।
কেন হঠাৎ এই প্রস্তুতি?
ব্রিটেনের নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর। গত সপ্তাহে রাশিয়া যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে “পরিণতি” ভোগ করার হুমকি দেয়। এর পাশাপাশি ইরান-ঘনিষ্ঠ হ্যাকারদের বিরুদ্ধে একটি ব্রিটিশ বিদ্যুৎ স্থাপনায় সাইবার হামলার অভিযোগ ওঠে।
ওই হামলায় একটি ছোট বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র কয়েক দিন সমস্যার মুখে পড়েছিল। যদিও জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনও বড় প্রভাব পড়েনি, তবু ঘটনাটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।
ব্রিটিশ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সংঘাতে শুধু সরাসরি সামরিক হামলা নয়, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পরিবহণ বা ডিজিটাল ব্যবস্থায় আঘাত করেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করা সম্ভব।
‘আতঙ্ক নয়, সাধারণ প্রস্তুতি’
সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন প্রচার অভিযানে নাগরিকদের ভয় দেখানো হবে না। বরং তাদের দৈনন্দিন জীবনে ছোট কিছু প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হবে।
এক সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, এটি কোনও “যুদ্ধকালীন আতঙ্ক ছড়ানোর প্রচার” নয়। বরং সাধারণ বুদ্ধি ব্যবহার করে কয়েক দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হবে।
পরিকল্পনায় রয়েছে কয়েক দিনের জন্য বোতলজাত জল রাখা, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন টিনজাত খাবার রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখা, বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবহারের জন্য ব্যাটারি বা হাতে ঘোরানো টর্চ রাখা ও জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা৷ সরকারের আগের ‘প্রস্তুতি’ নির্দেশিকাতেও জরুরি পরিস্থিতির জন্য এমন সামগ্রী রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
‘ওয়ার বুক’ নতুন করে সাজাচ্ছে সরকার
শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকারের নিজস্ব জরুরি প্রস্তুতিও নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ব্রিটেনের পুরনো ‘ওয়ার বুক’ বা যুদ্ধকালীন সরকারি প্রস্তুতি নথি হালনাগাদ করার কাজ দ্রুত করা হচ্ছে।
এই নথিতে বিদেশি হামলা, সাইবার আক্রমণ বা বড় ধরনের জাতীয় সংকটে সরকারের বিভিন্ন দফতর কী ভাবে কাজ করবে, তার পরিকল্পনা থাকে। জানা গেছে, সামরিক ও অসামরিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
সমালোচনাও শুরু
তবে সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। সমালোচকদের একাংশের বক্তব্য, নাগরিকদের খাবার ও জল মজুতের পরামর্শ দেওয়ার আগে সরকারের উচিত দেশের বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দুর্বলতা দূর করা।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞ ডায়েটার হেলম সতর্ক করে বলেছেন, ব্রিটেনের জ্বালানি ব্যবস্থা সাইবার হামলার ক্ষেত্রে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্য দিকে সরকার বলেছে, নাগরিক প্রস্তুতি কোনও ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি নয়; বরং আধুনিক বিশ্বের অনিশ্চয়তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটি অংশ।
নতুন যুগের নতুন প্রস্তুতি
শীতল যুদ্ধের সময় ব্রিটেনে নাগরিক সুরক্ষা নিয়ে সরকারি প্রচার চলেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি আলাদা। এখন হুমকি শুধু যুদ্ধ নয়৷ সাইবার হামলা, জলবায়ু পরিবর্তন, চরম আবহাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবায় বিঘ্নও বড় ঝুঁকি।
ব্রিটিশ সরকারের বার্তা তাই স্পষ্ট, বিপদ কখন আসবে তা জানা যায় না, কিন্তু প্রস্তুত থাকা যায়। আর সেই প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হিসেবে ঘরে কিছু জল ও খাবার রাখার পরামর্শই এখন দিচ্ছে লন্ডন।






