বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নজর রাখতে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান চান তুর্ক

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক। ছবি: ভিডিও থেকে
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নজরদারির জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক। আজ সোমবার জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনে বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তৃতায় তিনি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এ আহ্বান জানান।
ফলকার তুর্ক বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা এমন একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের দাবি জানিয়ে আসছি যা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নজরদারি রাখতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সামরিকীকরণের যে চরম নেতিবাচক পদ্ধতিগুলো রয়েছে, তা মোকাবিলায় আমরা সরকারগুলোর সঙ্গে কাজ করব। আমি জানি আপনাদের অনেকেই জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার নামে যা করা হয় তা নিয়ে অস্বস্তিতে আছেন। এই পুরোনো চর্চাগুলো সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই দানবকে কীভাবে বশে আনবেন? সেটিই মানবাধিকারের উদ্দেশ্য। মধ্য এশিয়াসহ সারা বিশ্বের সরকারের সঙ্গে আমাদের কাজ অব্যাহত থাকবে, যেন সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতি তৈরি করা যায়।’
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষ্যে ৪৪টি সুপারিশ করা হয়। তার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ড তদারকিতে স্বাধীন নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপের পাশাপাশি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বেসামরিক নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ ছিল।
ওই প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন তদারকির জন্য স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত জাতিসংঘের বিভিন্ন ট্রিটি বডির সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানেও বলা হয়েছিল, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কমিশনের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ নিশ্চিত করা এবং প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগপ্রক্রিয়া চালুর কথাও বলেছিল তারা।
বাংলাদেশে সম্প্রতি প্রণীত গুমবিরোধী আইন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করছে না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার সংগঠন ও আইনবিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আইনগুলোতে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, তদন্তক্ষমতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।
আজ বক্তব্যের শুরুতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদ উপেক্ষা করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমানে সর্বাধিক সংখ্যক সশস্ত্র সংঘাত বিশ্বজুড়ে চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, ইউক্রেনে রাশিয়ার দীর্ঘায়িত যুদ্ধ ও প্রাণঘাতী স্বায়ত্তশাসিত ড্রোনের ব্যবহার, সুদানের অব্যাহত গৃহযুদ্ধ এবং গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসনে লাখ লাখ বেসামরিক মানুষ চরম সংকটে পড়েছে। এর পাশাপাশি দক্ষিণ সুদান, ইয়েমেন ও ইথিওপিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চুক্তি লঙ্ঘন ও মানবতাবাদী কর্মীদের আটকের ঘটনা শান্তির পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই বিশ্বব্যাপী উন্মাদনা ও সংঘাত বন্ধে অবিলম্বে সব পক্ষকে অস্ত্র হস্তান্তর স্থগিত, কার্যকর যুদ্ধবিরতি জোরদার, জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং জাতিসংঘ সনদের ওপর ভিত্তি করে সংঘাত নিরসনে মূলধারার শান্তি আলোচনায় ফিরে আসার জোরালো আহ্বান জানানো হচ্ছে।’
ফলকার তুর্ক বলেন, যুদ্ধ মানবতার ব্যর্থতাকে ফুটিয়ে তোলে, আর শান্তির অন্বেষণ প্রকাশ করে এর সর্বউৎকৃষ্ট রূপকে। সংঘাত প্রতিরোধ, মানবাধিকার রক্ষা এবং সহিংসতার চক্র ভাঙতে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর তাদের মূল কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সাতটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধের নেপথ্যে থাকা বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ ও অর্থায়নকে উন্মোচন করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সত্য প্রকাশ ও পুনর্মিলনের মাধ্যমে ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ‘রূপান্তরকালীন বিচারব্যবস্থা’ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা করা।
একই সঙ্গে মানবাধিকারের ওপর ভিত্তি করে মধ্যস্থতার পরিবেশ তৈরি করা এবং গাজা, সুদান ও ইউক্রেনের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের শান্তি আলোচনায় নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব বৃদ্ধি করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া শান্তির জন্য লড়াই করা তৃণমূল সংগঠনগুলোকে সংহতি জানানো, সংঘাত সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই তা শনাক্ত করতে মানবাধিকারকে আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহার করা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) সমর্থনের পাশাপাশি ‘সার্বজনীন বিচারিক এখতিয়ার’ প্রয়োগ করে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হচ্ছে, যোগ করেন তিনি।





