বিশ্ববাজারে কেন কমছে স্বর্ণের দাম?

সংগৃহীত ছবি
বৈশ্বিক যেকোনো সংকটের মধ্যে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। কারণ, মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ হিসেবে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণ কিনে রাখা বাড়িয়ে দেন। তবে বর্তমান সময়ে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো।
গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর অঞ্চলটিতে যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধে্যও বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ধারাবাহিকভাবে কমছে।
গত ২৮ জানুয়ারি যেখানে প্রতি ট্রয় আউন্স (বৈশ্বিক পরিমাপের একক) স্বর্ণের দাম রেকর্ড ৫ হাজার ৩০৩ মার্কিন ডলারে উঠেছিল, তা গত শুক্রবার নাগাদ বড় পতনের মুখে পড়ে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে নেমে এসেছে।
যুদ্ধের মধ্যেও স্বর্ণের দাম এভাবে কমার পেছনে মূল কারণ আকাশছোঁয়া বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি। আর এই মূল্যস্ফীতির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার তো কমাবেই না, বরং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদের হার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, এমন আশঙ্কাই চাপে ফেলেছে স্বর্ণকে।
বর্তমান এই আকস্মিক মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে কাজ করছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই নৌরুটটি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হয়।
ফলে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ে। যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই বর্তমানে মূল্যস্ফীতি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪.২ শতাংশে পৌঁছেছে।
স্বর্ণকে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে ভালো বিনিয়োগ মাধ্যম মনে করা হলেও উচ্চ সুদের হার স্বর্ণের মূল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অর্থবিষয়ক ওয়েবসাইট অপশনস্প্রেডার্স ডটকমের প্রধান অপশন অ্যানালিস্ট জাস্টিন কার্ডওয়েল বলেছেন, ‘সম্পদের দিক থেকে বিবেচনা করলে স্বর্ণ প্রায় আসল টাকা বা নগদ অর্থের মতোই। এটি কোনো লভ্যাংশ দেয় না। বরং দাম বাড়ার মাধ্যমেই এর মূল্য উশুল হয়। মানুষ মূলত দাম বাড়ার আশায় স্বর্ণ কেনে।’
আর এই জায়গাতেই সুদের হারের সঙ্গে স্বর্ণের দামে সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। কার্ডওয়েল বলেছেন, ‘সুদের হার যখন চড়া থাকে এবং মানুষ ডলারের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ কমে যায়।’
ইরানের চলমান সংঘাত মার্কিন ডলারের জন্য ইতিবাচক হিসেবে কাজ করেছে। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই ডলার এবং স্বর্ণের সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।
নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কলিন প্লাম বলেছেন, ‘ডলার যখন শক্তিশালী হয়, তখন স্বর্ণ চাপে পড়ে। আবার ডলার দুর্বল হলে স্বর্ণের দাম বাড়তে থাকে। বর্তমানে ডলার বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফলে স্বর্ণ সেই চাপের মুখোমুখি হচ্ছে।’
‘আগামী দিনগুলোয় স্বর্ণের দাম কেমন হবে তা অনিশ্চিত। কয়েক মাস আগেও ধারণা করা হয়েছিল সুদের হার কমানো হবে। যার ফলে সব ধরনের সম্পদের দাম বাড়ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। আমরা এখন সুদের হার আরও বৃদ্ধির আশঙ্কার মুখে রয়েছি’, বলছিলেন প্লাম।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।
তবে ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্ত অনুমান করার সূচক সিএমই ফেডওয়াচের হিসাব অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা এখন ৫০ শতাংশেরও বেশি।
নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান প্লামের মত, এটা স্বর্ণের বাজারে বড় প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেছেন, ‘সুদের হার এবং মূল্যস্ফীতি যেন একটি দোলনার দুই দিক। আর স্বর্ণ ঠিক এর মাঝখানে অবস্থান করে। চলতি বছরে এই দুটি জিনিসই একসঙ্গে ঘটছে। আর এই মুহূর্তে সুদের হারের দিকটিই জিতে যাচ্ছে। এ কারণেই স্বর্ণ বাধার মুখে পড়েছে।’
তবে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির খবর আসার পর আগের দিনের তুলনায় স্বর্ণের দাম কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থানে থেকে বাজার বন্ধ হয়েছে।
সূত্র : আলজাজিরা




