জেনেভায় শান্তির শেষ অধ্যায়

সংগৃহীত ছবি
জেনেভার আকাশ আজ অদ্ভুতভাবে নীরব। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে অগণিত বিস্ফোরণ, অস্থিরতা আর ইতিহাসের ভার। যুদ্ধ আর শান্তির মধ্যের সরু সীমারেখায় দাঁড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান— দুই পক্ষ, যাদের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই সন্দেহ, সংঘাত আর শক্তির রাজনীতিতে জট পাকিয়ে আছে। আজ সেই দীর্ঘ অস্থির অধ্যায়ের ভেতরেই নতুন এক মোড়ের সম্ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে।
বিশ্ব মিডিয়ার চোখ এখন সুইজারল্যান্ডের জেনেভার দিকে। গুঞ্জন উঠেছে, আজ রবিবার সেখানেই হতে পারে বহুল প্রতীক্ষিত একটি শান্তিচুক্তির স্বাক্ষর। রইটার্স, আলজাজিরা, গার্ডিয়ানসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করছে— যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের একটি কাঠামো প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। দীর্ঘদিনের পর্দার আড়ালের কূটনীতি, মধ্যস্থতাকারীদের দৌড়ঝাঁপ এবং অনানুষ্ঠানিক আলোচনার ফল হিসেবে এই মুহূর্তটি সামনে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, এমন মুহূর্তগুলো প্রায়ই শেষ মুহূর্তের বাঁকে গিয়ে বদলে যায়। তাই এই সম্ভাব্য চুক্তি ঘিরে যেমন আশার আলো দেখা যাচ্ছে, তেমনি ছায়ার মতো লুকিয়ে আছে গভীর অনিশ্চয়তাও।
গত শুক্রবার পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানান— উভয় পক্ষ একটি খসড়া কাঠামোতে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি বড় অগ্রগতি এবং খুব দ্রুত চূড়ান্ত স্বাক্ষরের দিকে যাওয়া সম্ভব। এমনকি দু-এক দিনের মধ্যেই চুক্তি বাস্তবায়নের আশা করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়।
কিন্তু এই আশাবাদের বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে ইরান আরও সতর্ক এবং অনেক ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, আলোচনায় এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খোলা আছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে সময় লাগবে। তবে তিনি একই সঙ্গে দাবি করেছেন, এই প্রাথমিক সমঝোতা ইরানের জন্য শুধু কূটনৈতিক অগ্রগতি নয়; বরং সংঘাতের মধ্যেও তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। তার ভাষায়, ‘ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে।’
এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। কারণ একই আলোচনার টেবিলে যখন শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, তখন এক পক্ষ বিজয়ের দাবি করছে, যা পুরো প্রক্রিয়ার জটিলতা আরও বাড়িয়ে দেয়। এর মধ্যেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, চুক্তির শুধু কাঠামো নয়, বরং ভাষাগত খসড়ায়ও দুই পক্ষ একমত হয়েছে। তার মতে, মধ্যস্থতাকারীরা এখন চূড়ান্ত সমন্বয়ের কাজ করছেন এবং শিগগির একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা আসতে পারে।
শাহবাজ শরিফের এমন বক্তব্যের মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের একটি ঘোষণা যেন পুরো বিষয়টিকে এলোমেলো করে দিল। তিনি বলেছেন, প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের ইঙ্গিত সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি রবিবার হচ্ছে না।
এসব আলোচনার মধ্যেও কিন্তু অস্থিরতা যেন থেমে নেই। এই সময়ের মধ্যেই হরমুজ প্রণালির দিকে যাওয়া কয়েকটি ইরানি ড্রোন যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভূপাতিত করেছেন। মার্কিন পক্ষ দাবি করেছে, এই ড্রোনগুলো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছিল। পরে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বিষয়টি নিশ্চিত করে। অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, তাদের জলসীমার নিরাপত্তা রক্ষার অংশ হিসেবেই তারা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
এ ঘটনার কিছু সময় পরই ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে সিরিক বন্দর ও কেশম দ্বীপ এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, অননুমোদিতভাবে জলপথ পার হওয়ার চেষ্টা করা কিছু জাহাজকে সতর্ক করতেই গুলি চালানো হয়েছিল।
এমন উত্তেজনার মধ্যেও চুক্তির খসড়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ আবার খুলে দেওয়া হবে এবং ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল স্বাভাবিক করা হবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারে এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থাকা চাপ কমাতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তাই এ অঞ্চল ঘিরে যেকোনো অস্থিরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারকে নাড়িয়ে দেয়।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দাবি, ইরানকে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং ধীরে ধীরে তার পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করতে হবে। একই সঙ্গে কঠোর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও চালু করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু ইরানের অবস্থান এখানেও ভিন্ন। দেশটি বলছে, তারা সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করবে না। বরং এটি সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে চালিয়ে যেতে চায়। এই পার্থক্যই আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে আছে।
খসড়া প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে ইরানের জব্দকৃত অর্থ ছাড় দিতে পারে এবং তেল রপ্তানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারে। এসব সুবিধা ধাপে ধাপে দেওয়া হবে— শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করে। একই সঙ্গে ইরানকে আঞ্চলিক কিছু নীতি পরিবর্তন এবং বিভিন্ন অভিযোগ অনুযায়ী অর্থায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার কথাও বলা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরান পুরো শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত বড় কোনো অর্থ ছাড় দেওয়া হবে না। বরং প্রতিটি ধাপ বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে সুবিধা কার্যকর হবে। অন্যদিকে ইরানকে হরমুজ প্রণালির নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।
এই পুরো আলোচনায় আরেকটি বড় অনুপস্থিতি হলো ইসরায়েল। তারা এই প্রক্রিয়ার অংশ নয় এবং সরাসরি আলোচনায়ও ছিল না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তার দেশ এই চুক্তির অংশ হবে না এবং নিজেদের নিরাপত্তা নীতি নিজেরাই নির্ধারণ করবে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বলা হচ্ছে— আজই জেনেভায় ইতিহাস লেখা হতে পারে, যেখানে দুই দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ শান্তির পথে হাত মেলাবে। অন্যদিকে বাস্তবতা বলছে, শেষ মুহূর্তে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তাই পুরো বিশ্ব এখন এক অস্থির অপেক্ষায়। যদি চুক্তি হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। আর যদি না হয়, তবে এই ব্যর্থতাও হয়তো ভবিষ্যতের আরও বড় সংঘাতের ইঙ্গিত হয়ে থাকবে।


