চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে স্থলসেতু চালু, যে কারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ

ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘ বিলম্বের পর চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে একটি সড়কসেতু চালু হয়েছে। ইয়ালু নদীর ওপর নির্মিত ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদং এবং উত্তর কোরিয়ার সিনুইজু শহরকে যুক্ত করেছে।
পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে অনেকটা একঘরে উত্তর কোরিয়া। দেশটির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। নতুন এ সেতু দেশ দুটির বাণিজ্যের প্রধান স্থলপথ হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০১৪ সালে সেতুটি চালুর কথা ছিল। তবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় সেতুর সংযোগ সড়ক ও শুল্কসুবিধা নির্মাণ বন্ধ করে দেয় উত্তর কোরিয়া। পরে অনির্দিষ্টকালের জন্য সেতুটি চালুর পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়।
সেতুটি চীন-কোরিয়া মৈত্রী সেতুর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী জাপানের দখলদারিত্বের সময় সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেছেন, সেতুটি দুদেশের মধ্যে যোগাযোগের জন্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো’। তার ভাষায়, এ পথ ‘বাণিজ্য ও দুই দেশের জনগণের মধ্যে আদান-প্রদান আরও সহজ করবে’।
গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। তবে সেতু চালুর ফলে রাতারাতি বাণিজ্য বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।
হানকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের চীনা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাং জুন-ইয়ং বলছিলেন, উত্তর কোরিয়ার ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা এখনো কার্যকর রয়েছে।
তার ভাষ্য, ‘চীন থেকে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি নিয়েও পিয়ংইয়ং সতর্ক। এতে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনের প্রভাব অনেক বেড়ে যেতে পারে।’
কাং জুন-ইয়ংয় বলছেন, ‘চীন এসব উদ্বেগ সম্পর্কে ভালোভাবেই জানে। তাই বাণিজ্য ধীরে ধীরে বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।’
চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা রয়েছে। অন্য কোনো দেশের সঙ্গে চীনের এমন চুক্তি নেই। তবে দেশদুটির মধ্যে দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্কে টানাপড়েনও আছে।
২০১০-এর দশকের বড় একটি সময় বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ক শীতল ছিল। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে চীনের ধৈর্য কমে আসছিল। ২০১৭ সালে কিম জং উন পারমাণবিক পরীক্ষা চালান। এরপর তিনি নিষিদ্ধ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা বাড়ান। এতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়ে এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে দেশটির সামরিক জোট আরও শক্তিশালী হয়।
সাম্প্রতিক উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে চীনের মনোভাব বদলেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এডওয়ার্ড হাওয়েল বলছেন, ‘মাত্র এক দশক আগেও বেইজিং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রকাশ্য সমালোচনা করত এবং দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার আহ্বান জানাত। এখন চীন এ বিষয়ে প্রায় কিছুই বলছে না।’
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যাওয়া এ পরিবর্তনের একটি কারণ।
ধারণা করা হয়, ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে উত্তর কোরিয়ার অন্তত ২ হাজার ৩০০ সেনা নিহত হয়েছেন। এর বিনিময়ে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে তেল সরবরাহ করছে। ২০২৪ সালে পিয়ংইয়ংয়ের অস্ত্র ও সেনা সহায়তার বিনিময়ে রাশিয়া ১০০ কোটির বেশি ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
গত মাসে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে প্রথম সড়কসেতু চালু হয়। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল, সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০০টি যানবাহন ও ২ হাজারের বেশি মানুষের চলাচল সম্ভব হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর নিজেদের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বেইজিং।
করোনা মহামারির কারণে ছয় বছর বন্ধ থাকার পর গত মার্চে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু করে এয়ার চায়না। একই মাসে দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও আবার শুরু হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি



