নতুন বিশ্ব গড়ছেন ক্রিপ্টো বিলিয়নিয়াররা

ডানিউব নদীর বন্যাপ্রবণ সমতলভূমিতে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র রাষ্ট্র লিবারল্যান্ডের দিকে তাকিয়ে আছেন এক নারী
টাকা দিয়ে কি ভোটের ক্ষমতা কেনা সম্ভব? এমন একটি সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন বিশ্বের কয়েকজন ক্রিপ্টো বিলিয়নিয়ার। তাদের অর্থায়নে গড়ে ওঠা লিবারল্যান্ডে ভোট, সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মও তৈরি হচ্ছে ব্লকচেইন প্রযুক্তিকে ঘিরে।
সমর্থকদের দাবি, এটাই ভবিষ্যৎ।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, এতে ক্ষমতা কার হাতে যাবে শেষ পর্যন্ত?
ডানিউব নদীর মাঝখানে কাদাময় সমতলভূমি। যেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য অ্যাল্ডার গাছ। কয়েকটি তাঁবু আর গাছের ওপর বানানো হয়েছে ছোট ঘর। নৌকা থেকে দেখলে জায়গাটি মোটেও বিশেষ কিছু মনে হয় না। কিন্তু এই ভূখণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন বিশ্বের কয়েকজন ধনী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। তাদের মধ্যে রয়েছেন ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসার অন্যতম বড় প্রাথমিক বিনিয়োগকারীও।
বাস্তবে জায়গাটি যতটা সাধারণ, ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে তার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বিশ্বখ্যাত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান জাহা হাদিদের জেডএইচএ ডিজাইন করা ভার্চুয়াল লিবারল্যান্ডে রয়েছে ঝকঝকে আকাশচুম্বী ভবন, ভাসমান উদ্যান এবং ভবিষ্যতমুখী জলনির্ভর স্থাপনা।
এই কল্পিত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ভিট ইয়েডলিচকা। তিনি সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার বিরোধপূর্ণ একটি ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠা করেন ‘লিবারল্যান্ড’ নামে এই মাইক্রোনেশন।
তার লক্ষ্য, এমন একটি ডিজিটাল ও চরম স্বাধীনতাবাদী রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যা পরিচালিত হবে ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে।
বিবিসি টুর প্রামাণ্যচিত্র দ্য টেক বিলিয়নিয়ার টেকওভার নির্মাণের অংশ হিসেবে গত এক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে লিবারল্যান্ড। বাইরে থেকে এটি কৌতুকের বিষয় মনে হলেও, বাস্তবে ক্রিপ্টো জগতের এটি পরিচালিত হচ্ছে কয়েকজন বিলিয়নিয়ারের অর্থায়নে। তাদের বিশ্বাস, একসময় সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তে গড়ে তোলা সম্ভব হবে প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প কাঠামো।
বর্তমানে লিবারল্যান্ডে যেতে হয় নৌকায়। কারণ ক্রোয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ বাধা দেয় স্থলপথে প্রবেশে। সেখানে পৌঁছে দেখা যায়, কয়েকজন বাসিন্দা তীর থেকে হাত নেড়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ইয়েডলিচকা মেগাফোনে কথা বলে আনুষ্ঠানিক পদকও প্রদান করেন একজন বাসিন্দাকে।
লিবারল্যান্ডের রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলিত গণতন্ত্রের চেয়ে ভিন্ন। এখানে ভোটের ক্ষমতা নির্ভর করে ‘লিবারল্যান্ড মেরিটস’ নামে একটি ক্রিপ্টো টোকেনের ওপর। যার কাছে যত বেশি টোকেন, নেতৃত্ব নির্বাচনে তার প্রভাবও তত বেশি। অর্থাৎ এখানে অর্থ দিয়েই কার্যত বেশি ভোটাধিকার অর্জন করা যায়।
রাষ্ট্রটি সম্পূর্ণ করমুক্ত। লিবারল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্রোয়েশিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য ইভান পেরনারের ভাষ্য, স্বাধীনতাবাদ ও বিকেন্দ্রীভূত অর্থব্যবস্থায় বিশ্বাসীরা সাধারণত সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ।
তিনি আরও বলেছেন, ‘যদি কোনো বাছবিচার ছাড়া সবাইকে স্বাগত জানানো হয়, তাহলে যুক্তরাজ্যের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে। আমরা তা চাই না।’
এখানে কিছু মানুষের স্বাধীনতা অন্যদের চেয়ে বেশি কি না প্রশ্ন করা হলে উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘অবশ্যই।’
পেরনারের মতে, সম্পদহীন মানুষ বেশি হলে তাদের জন্য ব্যয় বহন করতে হবে অন্যদের। তিনি দরিদ্রদের প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ‘প্রাণীদের সবসময় খাওয়ালে তারা নিজের খাবার জোগাড় করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মানুষের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।’
লিবারল্যান্ডের ধনী সমর্থকদের মতে, দরিদ্রদের সহায়তা করা, কর আদায় বা সম্পদ পুনর্বণ্টনের মতো ব্যবস্থা ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী।
কলা বিলিয়নিয়ার জাস্টিন সান
লিবারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হলেন চীনা ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা জাস্টিন সান। তিনি এবং আরও প্রায় ৩০ জন প্রযুক্তি বিলিয়নিয়ারের অর্থায়নে ভবিষ্যতের লিবারল্যান্ড নির্মাণের পরিকল্পনা এগোচ্ছে বলে দাবি করা হয়।
জাস্টিন সানের সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৮৫০ কোটি মার্কিন ডলার। দেয়ালে ডাক্ট টেপ দিয়ে আটকানো একটি কলার শিল্পকর্ম ৬২ লাখ ডলারে কিনে পরে সেটি খেয়ে ফেলায় বিশ্ব জুড়ে আলোচনায় আসেন তিনি।
মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও বাজার কারসাজির অভিযোগ তুলেছিল। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং পরে ১ কোটি ডলার দিয়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি করেন।
তার প্রতিষ্ঠিত ট্রন একটি ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক। যেখানে কেন্দ্রীয় কোনো কর্তৃপক্ষ ছাড়াই লেনদেন করা যায় ক্রিপ্টোকারেন্সি। একই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে লিবারল্যান্ডের প্রশাসনিক ব্যবস্থায়ও। নাগরিকরা ডিজিটাল টোকেনের মাধ্যমে আইন ও গণভোটে অংশ নেন এবং ফলাফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করে সফটওয়্যার। যদিও বাস্তবে আইন কার্যকর করতে এখনো মানুষের ভূমিকা প্রয়োজন।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ ক্রিপ্টো লেনদেনের অন্যতম বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ট্রন। এর মধ্যে হামাস, হিজবুল্লাহ, মাদকচক্র ও অপরাধী নেটওয়ার্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। তবে জাস্টিন সানের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের ফলে অবৈধ লেনদেন কমেছে অনেকটা।
ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের প্রধান টোকেন বিনিয়োগকারীও জাস্টিন সান।
প্রতিষ্ঠানটিতে ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছেন তিনি। পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিম কয়েনেও কয়েক মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন, যার সুবাদে ট্রাম্পের সঙ্গে নৈশভোজের সুযোগ পান।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক পদ ছেড়ে দিলেও তার পারিবারিক ট্রাস্ট এখনো মালিকানার অংশ ধরে রেখেছে এবং ইউএসডি১ নামের স্টেবলকয়েন থেকে লাভ করছে। গত এক বছরে ট্রাম্প ক্রিপ্টো খাত থেকে ১৪০ কোটির বেশি মার্কিন ডলার আয় করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
রাষ্ট্রের বিকল্প কি ব্লকচেইন?
জাস্টিন সানের মতে, পৃথিবীর কোনো প্রকৃত সীমান্ত নেই। মহাকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার পর তার উপলব্ধি, রাষ্ট্রের ধারণা একদিন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়তে পারে। সেই কারণেই তিনি লিবারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
লিবারল্যান্ড একমাত্র উদাহরণ নয়। হন্ডুরাসের প্রসপেরা, পিটার থিয়েলের সিস্টেডিং ইনস্টিটিউট এবং টিম ড্রেপারের ড্রেপার নেশনসহ আরও কয়েকটি প্রকল্প একই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করছে।
প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী টিম ড্রেপারের দাবি, সরকার ব্যয়বহুল ও অদক্ষ সেবা দেয়। তার বিশ্বাস, একসময় ব্লকচেইনই প্রতিস্থাপন করবে সরকারকে।
এই ধারণার অন্যতম তাত্ত্বিক কার্টিস ইয়ারভিন। তার ‘প্যাচওয়ার্ক’ ধারণা অনুযায়ী, বর্তমান জাতিরাষ্ট্রের পরিবর্তে শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন অসংখ্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গড়ে উঠবে, যেগুলো নাগরিক আকর্ষণে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো প্রতিযোগিতা করবে।
ইয়ারভিনের কল্পনায় এসব রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন সিইও বা রাজা। আর তাদের তদারকি করবে গোপন শেয়ারহোল্ডার বোর্ড।
প্রতিবেদনটির পর্যবেক্ষণ হলো, অনেক প্রযুক্তি বিলিয়নিয়ার মনে করেন ভবিষ্যতে প্রচলিত সরকারব্যবস্থার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে ব্লকচেইনভিত্তিক নতুন শাসনব্যবস্থা। তাদের দৃষ্টিতে প্রযুক্তিই হবে প্রকৃত ক্ষমতার উৎস।
ফক্স বিজনেসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক নির্বাচনী চক্রে ক্রিপ্টো শিল্পের লবিং ব্যয় ২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যা ছাড়িয়ে গেছে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পকেও।
জাস্টিন সান, টিম ড্রেপার, কার্টিস ইয়ারভিন ও লিবারল্যান্ডের উদাহরণ ভবিষ্যতের এমন এক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে সরকার নয়, প্রযুক্তি ও ব্লকচেইন হবে ক্ষমতার কেন্দ্র।
তবে শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি সরকারকে প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়, তাহলে সেই ক্ষমতা কার হাতে যাবে? প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ বলছে, এখন পর্যন্ত দেখা প্রতিটি উদাহরণে ক্ষমতা ও সম্পদ শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীভূত হয়েছে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণকারীদের হাতেই।
সূত্র: বিবিসি







