নেপালের দুর্গম পাহাড়ে উড়ছে মানবতার ডানা
- ত্রাণের অমৃত থেকে শেষযাত্রার চিতা
- সবখানেই ড্রোন ফিরিয়ে আনছে লাশ, বাঁচিয়ে রাখছে প্রাণ

প্রযুক্তি তখনই সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের পাশে দাঁড়ায়। বিপর্যয়ের অন্ধকারে যখন মানুষের হাত পৌঁছায় না, যখন রাস্তা-সেতু ভেসে যায়, তখন আকাশপথে উড়ে আসা একটি ছোট্ট যন্ত্রও হয়ে উঠতে পারে বেঁচে থাকার শেষ আশার আলো। হিমালয়ের বুক চিরে নেমে আসা ভোটেকোশীর ভয়াবহ বন্যায় সেই আশার নাম এখন 'ড্রোন’। কখনও তার পেটে খাবার, কখনও ওষুধ; আবার কখনও বহন করছে হারিয়ে যাওয়া মানুষের নিথর দেহ।
নেপালের পাহাড়ি জনপদে বন্যার স্রোত ভেঙে দিয়েছে যোগাযোগের পথ। বহু এলাকায় উদ্ধারকারীদের পক্ষে পায়ে হেঁটে পৌঁছানোও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ঠিক সেই জায়গাতেই নতুন দায়িত্ব নিয়েছে ড্রোন, যা একদিকে দুর্গত মানুষের কাছে জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে, অন্যদিকে ফিরিয়ে আনছে মৃতদের শেষ সম্মান।
গত বুধবার ইনকোয়ারারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের এই দুর্যোগে ড্রোন শুধু নজরদারি বা অনুসন্ধানের যন্ত্র নয়, বরং সরাসরি উদ্ধার অভিযানের অংশ হয়ে উটেছে। দুর্গম এলাকায় যেখানে প্রচলিত যানবাহন পৌঁছাতে পারছে না, সেখানে আকাশপথে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
আরও বড় চমক দেখা গেছে নুওয়াকোটের দেবীঘাট এলাকায়। গত মঙ্গলবার কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে উদ্ধারকারীরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যেখানে বিপজ্জনক ভূখণ্ডের কারণে মানুষের পক্ষে মরদেহ সরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে ড্রোন ব্যবহার করে সাতটি মরদেহ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় এই বিশেষ অভিযান।
উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, দেবীঘাট-৩ থেকে দেবীঘাট-৫ পর্যন্ত মরদেহ বহনে ব্যবহার করা হয় ভারী মাল বহনে সক্ষম শিল্প পর্যায়ের ড্রোন। যে প্রযুক্তি সাধারণত পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়, ভোটেকোশীর বিপর্যয়ে সেটিই হয়ে উঠেছে মানুষের শেষ যাত্রার বাহন।
তবে ড্রোনের কাজ শুধু মরদেহ উদ্ধারে সীমাবদ্ধ নেই। দুর্গত মানুষের কাছে খাবার, পানি ও জরুরি ওষুধ পৌঁছে দিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে এই প্রযুক্তি। ড্রোন পরিচালনাকারীরা জানিয়েছেন, কোথায় কী প্রয়োজন, সেই তথ্য সংগ্রহ করেও সহায়তা পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ড্রোন পরিচালনাকারী মিলন পান্ডে জানান, তাঁদের দল মাত্র তিন দিনে দুর্গত এলাকায় প্রায় ১ দশমিক ৫ টন জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে। রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়া এলাকায় হেলিকপ্টারের তুলনায় ড্রোন অনেক কম খরচে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে পারছে।
নেপালে ড্রোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো সেখানে ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশটির স্থানীয় প্রযুক্তি দলগুলো দুর্যোগ মোকাবিলায় ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করেছে।
তবে এই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ড্রোনের বহনক্ষমতা, উড়ার দূরত্ব এবং প্রতিকূল আবহাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। তবু যেখানে মানুষের পা পৌঁছাতে পারে না, যেখানে বড় যানবাহন থেমে যায়, সেখানেই ছোট্ট এই যন্ত্রটি হয়ে উঠছে বড় সহায়।
ভোটেকোশীর স্রোত কেড়ে নিয়েছে বহু প্রাণ, ভেঙে দিয়েছে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ড্রোন যেন আরেকটি গল্প বলছে, প্রযুক্তি শুধু যন্ত্র নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ালে সেটিই হয়ে উঠতে পারে মানবতার সবচেয়ে শক্তিশালী হাত।
পাহাড়ের আকাশে উড়তে থাকা সেই ড্রোনগুলো তাই শুধু খাবার বা মরদেহ বহন করছে না, বহন করছে একটাই বার্তা, প্রকৃতির কাছে মানুষ যতই অসহায় হোক, আশা বেঁচে থাকে।





