৫ বছরে ১ লাখ প্রাণহানি
এশিয়ার রক্তাক্ত কসাইখানা মিয়ানমার

ছবি: রয়টার্স
পেট ভরা মণি-মাণিক্যের খনি মিয়ানমার আজ হাজারো লাশের বধ্যভূমি । এককালের সূবর্ণভূমি (দ্য গোল্ডেন ল্যান্ড) খ্যাত রত্নগর্ভা এই সোনালি মাটির নিচেই আজ চাপা পড়ে আছে হাজার হাজার নিথর প্রাণ। জান্তার বুট-বুলেটে ক্ষত-বিক্ষত দেশটি এখন রূপ নিয়েছে ‘এশিয়ার রক্তাক্ত কসাইখানা’য়। সেনা শাসনের নির্মম দমনপীড়ন, জাতিগত নিধনযজ্ঞ আর গৃহযুদ্ধের আগুনে পুড়ে ছাই শান্তিপ্রিয় দেশটির গণতন্ত্রের মানচিত্র। ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৫৭৮ বর্গকিলোমিটারে এখন রক্তের স্রোত, লাশের স্তূপ আর কান্নার রোল। কামানের গোলা আর বিমানের শব্দে উড়ে গেছে শান্তির পাখি। অভ্যুত্থানের পর গত ৫ বছরে দেশটিতে প্রাণ হারিয়েছে ১ লাখ মানুষ! তবু ক্ষান্ত হয়নি ‘উন্মাদ স্বৈরাচার’। ক্ষমতার রাক্ষুসে থাবায় এখনো প্রতিদিনই ঝরছে তরতাজা-টগবগে প্রাণ। ভয়ে দেশ ছাড়ছে লাখ লাখ মানুষ।
দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে ভিজেছে মিয়ানমারের মাটি। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর নেমে আসা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ। গত বুধবার প্রকাশিত সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সব পক্ষ মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১১৪ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন মিয়ানমারে। বিশ্লেষকরা এই সংঘাতকে বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ এবং বিশ্বের সবচেয়ে খণ্ডিত সংঘাত হিসেবে বর্ণনা করছেন। জান্তা সরকার, ১,২০০-এর বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বহুমুখী লড়াই এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা আইনের কারণে গভীর মানবিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটে ডুবে গেছে মিয়ানমার।
গৃহযুদ্ধের মূল চিত্র ও ভয়াবহ প্রাণহানি
রেকর্ড মৃত্যু: ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে ১ লাখ ১১৪ জন মানুষ নিহত হয়েছেন, যা বর্তমানে এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত।
চরম মানবিক সংকট: জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে ৩৭ লাখেরও বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত এবং প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জন মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগছেন।
বিশ্বের সবচেয়ে খণ্ডিত সংঘাত: মিয়ানমারে এখন ১,২০০-এর বেশি ভিন্ন ভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। সংঘাতের ভয়াবহতা ও বিস্তৃতির দিক থেকে গত বছর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পরেই মিয়ানমার ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংঘাতপূর্ণ এলাকা।
ভূ-রাজনীতি ও সামরিক পরিস্থিতি
চীনের প্রভাব ও যুদ্ধবিরতি: ২০২৩ সালের শেষের দিকে বিদ্রোহীরা মান্দালয় শহরের দিকে অগ্রসর হয়ে বড় সাফল্য পেলেও, পরে চীনের সমর্থন ও মধ্যস্থতায় সামরিক জান্তা পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনে এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা আইন: ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমার তার আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চালু করে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ (কনস্ক্রিপশন) ব্যবস্থা। এর অধীনে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী নারীদের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই এদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর লক্ষ্য ছিল প্রতি বছর ৫০ হাজার নাগরিককে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করা। সম্মুখসারিতে দায়িত্ব পালনের পর পালিয়ে আসা এক প্রাক্তন নিয়োগপ্রাপ্ত সেনা সদস্য বলেছেন, ‘এভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের আসলে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। মনে হয় যেন তাদের শুধু মৃত্যুর মুখেই ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।’ নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২০ বছর বয়সী ওই তরুণ বলেছেন, ‘এক জায়গায় না মরলে তারা আপনাকে অন্য কোনো জায়গায় পাঠিয়ে দেয়।’
অর্থনীতির ওপর প্রভাব
থাইল্যান্ডে গণ-অভিবাসন: সামরিক অত্যাচার এবং বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এড়াতে লাখো তরুণ ও সাধারণ মানুষ দেশ ছাড়ছেন। আইওএম’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে আনুমানিক ৪৬ লাখ মিয়ানমারের নাগরিক বসবাস করছেন। এর মধ্যে শুধু গত বছরই প্রধান সীমান্ত পথগুলো দিয়ে ২০ লাখ এবং পরবর্তী চার মাসেই আরও ৭ লাখ মানুষ থাইল্যান্ডে পালিয়ে গেছেন।
থাই অর্থনীতিতে প্রভাব: থাইল্যান্ডে পালিয়ে আসা মিয়ানমারের নাগরিকরা সেখানে একটি বিশাল ভোক্তা-গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছেন। বর্তমানে থাই অর্থনীতিতে তাদের বার্ষিক ক্রয়ক্ষমতা ২২১ বিলিয়ন বাথ বা প্রায় ৬ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।
সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থা: জান্তা-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থা বর্জন করে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা সমান্তরাল ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’র অধীনে নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোয় পরিচালিত এই ব্যবস্থায় প্রায় ৬,০০০ স্কুলে ৭ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করছে। এর বাইরে থাইল্যান্ডে মিয়ানমারের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আগের চেয়ে ছয় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অবৈধ অর্থনীতির বিস্তার: যুদ্ধের বিশাল তহবিল জোগাতে মিয়ানমারের বিবদমান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মাদক উৎপাদন (হেরোইন, মেথামফেটামিন) এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো এখন আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের (স্ক্যাম সেন্টার) প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।
দেশের বাইরে যুদ্ধের প্রভাব
এই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশের বাইরেও পড়েছে; প্রতিবেশী থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলো বাস্তুচ্যুত মানুষের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে গেছে এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রগুলোর বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সব পক্ষের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোই হেরোইন ও মেথামফেটামিনের মতো মাদকের ব্যাপক উৎপাদন থেকে অর্জিত মুনাফা দিয়ে তাদের যুদ্ধের তহবিল গড়ে তুলছে। এরই মধ্যে, মিয়ানমারের দুর্বল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো অনলাইন প্রতারণা চক্রের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে; এসব চক্র প্রায়শই জান্তা-সমর্থিত মিলিশিয়াদের কড়া পাহারায় থাকা সুরক্ষিত আস্তানা থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।






