নেপাল আলো করা জলবিদ্যুৎ বন্যার পর এখন প্রশ্নের মুখে

কাঠমান্ডুতে ক্রেতার অপেক্ষায় হাওয়াই মিঠাইয়ের প্যাকেট হাতে এক ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
একসময় বিদ্যুৎ ছিল নেপালের বড় দুর্বলতা। এখন সেই বিদ্যুৎই দেশটির অর্থনীতির অন্যতম ভরসা। পাহাড়ি নদীর স্রোত কাজে লাগিয়ে নেপাল বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাকি বিদ্যুৎ বিক্রি করছে ভারত ও বাংলাদেশে। এতে বছরে প্রায় ২০ কোটি ডলার আয় করছে কাঠমান্ডু।
কিন্তু হঠাৎ করেই ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁসের’ মতো এ খাতটিতে যেন লেগেছে বড় ধাক্কা।
তবে সম্প্রতিক বন্যা দেখিয়ে দিয়েছে, নেপালের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সুবিধাই বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। বন্যায় ত্রিশূলী নদী অববাহিকার ১২টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশেরও বেশি বন্ধ হয়ে গেছে।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এসব কেন্দ্রের অনেক কর্মী এখনো নিখোঁজ। কয়েকটি কেন্দ্রের সুড়ঙ্গ কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গেছে। উদ্ধারকারীরা সেখানে আটকে থাকা মানুষদের খুঁজছেন। সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযানে দুই কর্মীকে ৯দিন পর জীবিত পাওয়া গেছে।
নেপালের প্রায় পুরো বিদ্যুৎই আসে জলবিদ্যুৎ থেকে। দেশটির ২২৫টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে স্থাপিত সক্ষমতা ৩ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটের বেশি। আরও শত শত প্রকল্প নির্মাণাধীন বা পরিকল্পনায় রয়েছে।
এই নির্ভরতার পেছনে অবশ্যই সাফল্যের গল্প আছে।
এক দশক আগেও নেপালের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। ২০১০ সালে দেশটির মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পেত। সংযোগ থাকা পরিবারগুলোকেও দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হতো।
জলবিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ানো, দুর্নীতি কমানো এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়ানোর ফলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ২০১৮ সালের মধ্যে নেপালের বেশিরভাগ এলাকায় ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়।
এরপর শুরু হয় আরেক অধ্যায়। ২০২১ সালে নেপাল বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করে। বর্ষায় নদীতে পানি বাড়ে। তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ে। বাড়তি বিদ্যুৎ ভারত ও বাংলাদেশে বিক্রি করে আয় শুরু করে নেপাল।
কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে বড় ঝুঁকি। নেপালের অধিকাংশ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র পাহাড়ের অনেক ওপরে। সেখানে নদীর দ্রুত স্রোত কাজে লাগানো হয়। এসব প্রকল্পে বড় জলাধার বা পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা সাধারণত থাকে না।
অর্থাৎ নদীই তাদের শক্তির উৎস। আবার নদীই তাদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
হিমালয়ের উপরের এলাকা পৃথিবীর অন্য এলাকার তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এতে হিমবাহ, পাহাড়ের ঢাল ও নদী অববাহিকার স্থিতিশীলতা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
সাম্প্রতিক বন্যার প্রাথমিক তদন্তে একটি হিমবাহ ও তার নিচের পাথুরে ভূমি ধসে যাওয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই নির্দিষ্ট ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয়।
তবে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে হওয়া দুর্যোগের ৯০ শতাংশের বেশি ছিল জলবায়ুসংশ্লিষ্ট।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তাহলে কি নেপালের জলবিদ্যুৎ পরিকল্পনাতেই পরিবর্তন দরকার।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র রাজন ধাকালও মনে করেন, এখন সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, জলবায়ুসংশ্লিষ্ট দুর্যোগ বাড়তে থাকায় জলবিদ্যুৎ নীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী কুলমান ঘিসিংও মনে করেন, ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তৈরি করতে হবে। বন্যার আগাম সতর্কবার্তা এবং দ্রুত মানুষ সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথাও উঠছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ কুশল গুরুং বলেছেন, ‘সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা যাবে না।’ সৌর ও বায়ুশক্তির মতো বিকল্প উৎস বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বিবেক শাস্ত্রিও মনে করেন, সৌর ও বায়ুশক্তির উৎপাদন বাড়ানো বিদ্যুৎব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করতে পারে।
জার্মানির একটি সহায়তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা জলবিদ্যুতের সম্ভাবনার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি।
তবে নেপালের জন্য জলবিদ্যুৎ থেকে সরে যাওয়া সহজ নয়।
দেশটির জন্য পাহাড়ি নদীগুলোকে এখনো বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীদের তুলনায় জলবিদ্যুৎই দেশটির সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক শক্তি বলে মনে করেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের গবেষক পুষ্প শর্মা।
সমস্যা হলো, ঝুঁকি জেনেও জলবিদ্যুতে বড় বিনিয়োগ হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বন্যায় প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৬৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানও যুক্ত ছিল। আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পে অর্থ দিয়েছে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক।
সমালোচকদের প্রশ্ন, এসব প্রকল্পে ঝুঁকি কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছিল?
কারণ ত্রিশূলী অববাহিকায় এ ধরনের দুর্যোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালে এই এলাকায় আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। ২০২৫ সালেও তিব্বতে একটি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা নেমে এসেছিল একই নদীপথে। এতে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নেপাল-চীন বাণিজ্যপথও দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষও স্বীকার করছে, ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হলেও প্রকল্পের নকশায় সেই ঝুঁকি যথেষ্টভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
এবারের বন্যা তাই শুধু কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতির গল্প নয়। এটি নেপালের উন্নয়ন পরিকল্পনার সামনে বড় একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মত, কাঠমান্ডুর সামনে এখন মূল প্রশ্ন দুটি; জলবিদ্যুৎ কি নেপালের সবচেয়ে বড় শক্তি থাকবে? নাকি জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে সেটিই ধীরে ধীরে সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হবে?
উত্তর খুঁজতে গিয়ে নেপালকে হয়তো একসঙ্গে দুটো কাজই করতে হবে—জলবিদ্যুৎকে আরও নিরাপদ করা এবং বিদ্যুতের অন্য উৎসও দ্রুত বাড়ানো। কারণ পাহাড়ি নদীর শক্তিকে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আবার সেই শক্তির ওপর সবকিছু নির্ভর করাও এখন আর আগের মতো নিরাপদ নয়।
সূত্র: বিবিসি








