ইরাবতীর প্রতিবেদন
রাখাইনে জান্তার ২১ হামলায় অন্তত ৩৮৩ জন নিহত

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইন। ছবি: রয়টার্স
মিয়ানমারের আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরুর পর থেকে রাখাইন রাজ্যে বেসামরিকদের ওপর বর্বরোচিত অভিযান চালিয়ে আসছে দেশটির জান্তা। সংবাদমাধ্যম ও আরাকান আর্মির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দ্য ইরাবতীর এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিগত তিন বছরে রাখাইনে ২১টি গণহত্যা চালিয়েছে জান্তা বাহিনী। এসব হামলায় অন্তত ৩৮৩ জন নিহত এবং ৩৯৩ জন আহত হয়েছেন।
২০২৩ সালের নভেম্বরে রাখাইনে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার পর থেকে জান্তা বাহিনীর এসব হামলা বিশ্লেষণ করেছে ইরাবতী। যুদ্ধবন্দীদের বাদ দিয়ে কেবল বিমান হামলা ও স্থল অভিযানের যেসব ঘটনায় অন্তত পাঁচ বা তার বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন সেগুলোই হিসাব করা হয়েছে। এই তথ্যে রাখাইন রাজ্য এবং চিন রাজ্যের আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত পালেতোয়া জনপদের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে জান্তার নৃশংসতার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে কিয়াকতাও জনপদে (পাঁচটি)। এরপর সর্বোচ্চ ঘটনা ঘটেছে ম্রাউক-উতে (তিনটি)। এ ছাড়া থান্দওয়ে ও পালেতোয়ায় দুটি করে গণহত্যার ঘটনা ঘটে।
উল্লিখিত মাপকাঠি অনুযায়ী জান্তার প্রথম নথিবদ্ধ গণহত্যার ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ রাত ১টা ৩১ মিনিটে। মিনবিয়া জনপদের থারদার নামের একটি রোহিঙ্গা গ্রামে বিমান হামলায় ১১ শিশুসহ (যাদের বয়স ছিল ১ থেকে ১০ বছর) ২২ বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ২৯ জন আহত হন।
সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হত্যাকাণ্ড ঘটে ২০২৪ সালের ২৯ মে। সিত্তওয়ে রিজিওনাল অপারেশনস কমান্ড, পাকোক্কুভিত্তিক লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন ১০১ এবং জান্তাপন্থী আরাকান লিবারেশন পার্টির ১৭০ জনের বেশি সদস্যের একটি যৌথ বাহিনী সিত্তওয়ের ব্যাইনফিউ গ্রামে হামলা চালায়। আরাকান আর্মি জানায়, এসব সেনা সদস্য ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ মারাত্মক যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হয়। যার ফলে নারী ও শিশুসহ ৭৬ জন বেসামরিক প্রাণ হারান।
সম্প্রতি গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাখাইন রাজ্যের কিয়াকতাও জনপদের ইন্ডিয়ান মার্কেট এবং পার্শ্ববর্তী কিসাপানাদি (কালাদান) সেতুতে বোমাবর্ষণের ঘটনায় ৫০ বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৫৭ জন আহত হন। গত তিন বছরে রাখাইনে এটিই সবচেয়ে বড় বিমান হামলা। এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী গণহত্যার ঘটনাও।
এই হামলার ঘটনায় সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ।
মঙ্গলবার ইরাবতীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাকান আর্মির মুখপাত্র খাইং থুখা বলেন, ‘রণাঙ্গনে আমাদের সঙ্গে না পেরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে জান্তা বাহিনী।’
তিনি মন্তব্য করেন, জান্তা সরকার রাখাইনের বাসিন্দাদের শত্রু হিসেবে দেখে এবং তাদের হত্যা, ধ্বংস ও উচ্ছেদ করতে চায়।
খাইং থুখা উল্লেখ করেন, একাধিক ফ্রন্টে ব্যর্থ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপক প্রাণহানির মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এখন বেসামরিকদের ওপর চড়াও হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এটি একটি স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ।’
নিহত ব্যক্তিরা যে কোনো সশস্ত্র যোদ্ধা ছিলেন না বরং সাধারণ নাগরিক ছিলেন তা প্রমাণে আরাকান আর্মি নিহতদের নাম ও ঠিকানা প্রকাশ করেছে। তা সত্ত্বেও, জান্তাপন্থীরা দুই বছর আগে কিয়াকতাওয়ের কালাদান নদীতে যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ হিসেবে এসব গণহত্যার সাফাই গাইছে।
অন্যায় ও বর্বরোচিত এসব হামলার প্রতিক্রিয়ায় ফেসবুকে প্রখ্যাত রাখাইন লেখক ও ত্রাণকর্মী ওয়াই হান অং লেখেন, ‘যে জান্তা শাসকগোষ্ঠী নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে কাপুরুষের মতো হত্যা করাকে বিজয় মনে করে, তাদের নিন্দা জানানোর মতো কোনো ভাষা আমার জানা নেই।’
জান্তা পরিচালিত নির্বাচনের ঠিক আগে, ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ম্রাউক-উ হাসপাতালে জান্তার বিমান হামলায় মাত্র তিন মাসের এক শিশু ও নারীসহ ৩৩ জন নিহত এবং ৭৭ জন আহত হন। এ সময়সীমার মধ্যে এটি ছিল রাজ্যটিতে জান্তা বাহিনীর তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী গণহত্যা।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিন্দা সত্ত্বেও রাখাইনে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে জান্তা বাহিনীর পরিকল্পিত ও নৃশংস হামলা অব্যাহত রয়েছে।





