‘অলৌকিক কিছুর আশায়’ নেপালে বন্যায় নিখোঁজদের স্বজনরা

নেপালের বাসিন্দা অস্মিতা দাহালও ভাইয়ের ফেরার অপেক্ষায়। ছবি: রয়টার্স
নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যার পর স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে অনেকের। এরপর থেকেই উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তারা। কেউ প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায়। কেউ আবার রয়েছেন শুধু একটি ভালো খবরের আশায়।
নিউজিল্যান্ডের নাগরিক রাজীব রেড্ডি গত মঙ্গলবারের পর থেকে কোনো খোঁজ পাননি তার বোনের। সেদিন বোন তাকে জানিয়েছিলেন, বন্ধুদের সঙ্গে নেপাল-চীন সীমান্তে হাইকিংয়ে যাচ্ছেন তিনি।
রাজীবের ৪৪ বছর বয়সী বোন সুহাসিনী রেড্ডি কান্দিমাল্লার গতকাল বুধবার সকালে সড়কপথে সীমান্তে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে অভিবাসনসংক্রান্ত একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। এরপর তিব্বতের আউটার কোরা ট্রেইলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।
আজ বৃহস্পতিবার সফরটির আয়োজকরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়েছেন, ওই দলে থাকা ৩১ জনের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
দুই সন্তানের মা সুহাসিনী। তার সন্তানদের বয়স ৪ ও ১৬ বছর। তিনি নিয়মিত হাইকিং করতেন। নিউজিল্যান্ডে ফিরে আরও কয়েকটি ভ্রমণের পরিকল্পনাও ছিল তার। আগামী বছর মাউন্ট এভারেস্টে ওঠার ইচ্ছাও ছিল।
রাজীব বলেছেন, পরিবারের সবাই নেপালে থাকা আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কোনোভাবে বোনের খবর পাওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
‘আমরা আশা করছি, খুব শিগগির তাকে ফিরে পাব’, নিজেকে নিজে আশ্বস্ত করছিলেন রাজীব।
নেপালের বাসিন্দা অস্মিতা দাহালও ভাইয়ের ফেরার অপেক্ষায়। তার ভাষায়, পরিবার এখন ‘অলৌকিক কিছুর আশায়’ রয়েছে।
২১ বছর বয়সী সুমন দাহাল গতকাল বুধবার বোনকে শেষবার বলেছিলেন, ‘সকালে দেখা হবে।’
রাশুয়া জেলার সীমান্ত শহর তিমুরের সোনাম গেস্ট হাউজে একটি ট্যুর দলের সঙ্গে কাজ শেষ করেছিলেন তিনি। সেদিন রাতে দলটি চীনের সীমান্ত পার হওয়ার জন্য রওনা দিলেও সুমন কাঠমান্ডুতে ফেরার প্রস্তুতি নিতে সেখানে থেকে যান। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ নেই।
অস্মিতা জানিয়েছেন, সুমনের ফোন নাম্বার বন্ধ। তিনি বলেছেন, ‘আমরা জানি না সে কোথায় আছে। ভয় হচ্ছে, বন্যায় তার বাসটি ভেসে গেছে কি না। আমরা খুব চিন্তিত। তারপরও একটি অলৌকিক ঘটনার আশায় আছি।’
কাঠমান্ডুভিত্তিক পর্যটন প্রতিষ্ঠান কৈলাশ জার্নিস জানিয়েছে, বন্যায় তাদের সঙ্গে থাকা ২৬ বিদেশি পর্যটক ও পাঁচ নেপালি গাইড নিখোঁজ রয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির নেপাল কার্যক্রমের প্রধান সুজন ওয়াস্তি জানান, দলটি রাসুওয়াগাধি সীমান্ত দিয়ে নেপাল-চীন সীমান্তের দিকে যাচ্ছিল। পথে আকস্মিক বন্যার পানিতে বিভিন্ন গ্রাম ও শহর প্লাবিত হয়।
নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে আটজন আমেরিকান, সাতজন ব্রিটিশ, ছয়জন অস্ট্রেলিয়ান, একজন নিউজিল্যান্ডের, দুজন কানাডিয়ান, একজন দক্ষিণ আফ্রিকান ও একজন মালয়েশিয়ান নাগরিক ছিলেন। বিদেশিদের মধ্যে ১৩ জন পুরুষ ও ১৩ জন নারী।
নেপালে নিখোঁজ বাবা-মায়ের খবরের অপেক্ষায় জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রাধিকা শর্মা।
তার বাবা রমেশ শর্মা, বয়স ৬৫ বছর। মা নীলম শর্মা, বয়স ৬৪ বছর। তারা নেপালে ধর্মীয় তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন। নেপাল ট্রেকিং প্ল্যানার্স নামের একটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাতজনের একটি দলের সঙ্গে ছিলেন তারা।
নেপাল ও তিব্বতের হিমালয় অঞ্চল ধর্মীয় তীর্থযাত্রার জন্যও জনপ্রিয়। কারণ সেখানে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি তীর্থস্থান রয়েছে।
রাধিকা জানান, গতকাল বুধবার সকাল ৮টার দিকে ওই দলের সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগ হয়েছিল। তখন তারা তিব্বতের সীমান্তে পৌঁছেছিলেন। এরপর আর তাদের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
‘আমি শুধু জানি, তারা যেখানেই থাকুন না কেন, সম্ভবত ভয় পাচ্ছেন’, বলছিলেন রাধিকা। তার ভাষ্য, বাবা-মা নিশ্চয়ই তাদের দুই সন্তানকে নিয়েও চিন্তা করছেন। আর সন্তানদের এখন শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
নেপালের কর্মকর্তাদের হিসাবে, বন্যার পর ৩০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৭ জন আমেরিকান নাগরিক।
এর আগে, গতকাল বুধবার সকালে স্থানীয়রা যখন দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখনই উজান থেকে ১০০ মিটার উঁচু এক দানবীয় পানির দেয়াল ধেয়ে আসে। এই বন্যার পেছনে প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে দায়ী করা হলেও এর জন্য হিমবাহ ধস ও ভূমিধস দায়ী বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)।
ভয়াবহ এই বন্যায় নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ঘটনার পর আইসিআইএমওডি একটি বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৪০৩ জন। নিখোঁজ ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিকের বেশিরভাগই ভারতীয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জঙ্গল সাফারির জন্য জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র চিতওয়ানসহ কয়েকটি পৌরসভায় বন্যার পানি বাড়তে থাকায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় প্রায় আট টন ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এদিকে, তিব্বতের গিয়িরং কাউন্টিতে কাদাধসের ঘটনায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে বলে আজ সকালে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি।
নিখোঁজের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। মৃতের সংখ্যা এখন অবধি তিনজন রয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। গিয়িরং সীমান্ত চীন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক ও পণ্য পরিবহনের প্রধান প্রবেশপথ।









