ভূমিকম্প নয়, হিমবাহে ধস নেপালে বন্যার মূল কারণ বলে ধারণা

নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে হিমালয়ের উপত্যকাগুলোর স্যাটেলাইট চিত্র। ২৬ আগস্টের ছবি। ছবি: রয়টার্স
চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রাসুয়া জেলার ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৬৫ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৮২৬ জন। গতকাল বুধবার সকালে নেমে আসে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, তিব্বতেও নিহত হয়েছেন তিনজন। সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন কমপক্ষে ৫৫৮ জন।
আকস্মিক বন্যার কারণ নিয়ে প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও পরে সেই দাবি সংশোধন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ভূমিকম্প নয়, হিমবাহের একটি অংশ ধসে পড়ে এর সঙ্গে পাথর-মাটির ধস থেকে সৃষ্টি হয়েছে এ ভয়াবহ পরিস্থিতি।
নেপাল-চীন সীমান্তে স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে বলে প্রথমে জানানো হয়েছিল। পরে ইউএসজিএস স্পষ্ট করে জানায়, সেখানে কোনো ভূমিকম্প হয়নি।
প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে মার্কিন সংস্থাটি জানায়, রাসুওয়াগাধি সীমান্ত পয়েন্টের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে বরফ ও পাথরের বড় ধরনের ধস চীন থেকে নেপালে প্রবাহিত ভোতে কোশি নদীর শাখা লেন্দে নদীতে এসে পড়লে পানির প্রবল স্রোত নামিয়ে দেয়।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিশ্লেষণেও হিমবাহ ও পাথরের ধসের বিষয়টি উঠে এসেছে।
ঘটনাটি পরে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান কম্পন হিসেবে হিমবাহে ধসটিকে নথিভুক্ত করে ইউএসজিএস।
এদিকে, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বুধবার পার্লামেন্টে বলেছেন, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর তিন মিনিট পর, সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যার খবর পাওয়া যায়। তবে ভূমিকম্পের সঙ্গে বন্যা ও ভূমিধসের সম্পর্ক আছে কি না, সেটি যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রথম দিকে নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে সীমান্তের কাছে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। এর মাত্র তিন মিনিট পর আকস্মিক বন্যার খবর পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরাও স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে হিমবাহ ধসের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্ত বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, হিমবাহের নিচের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে এই বিপর্যয় শুরু হয়েছে। তার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলি নেমে এসেছে।
কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার একই সুরে বলেছেন, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকার বেশকিছু হিমবাহের বরফ গলে যাওয়ার চিহ্ন স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে। এতে উষ্ণ আবহাওয়ার প্রভাব থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
প্রায় ৫০ হাজার জনসংখ্যার পার্বত্য জেলা রাসুয়ার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় রয়েছে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।
এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজ এখানে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না এবং জলবায়ু পরিবর্তন এই ধসের পেছনে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন ড্যান শুগার।
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা (আইসিমোড) জানিয়েছে, নেপালের লেন্দে নদী চীন থেকে নেপালে প্রবেশ করে ভোতে কোশি নদীতে মিশেছে। বন্যার প্রবল স্রোতে পানি, পলি ও বড় বড় পাথর নদীপথে নেমে আসে। এতে ত্রিশূলী নদীর নিচের দিকে মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়।
তবে দুর্যোগের মূল কারণ নিয়ে নেপাল ও চীনের কর্তৃপক্ষের কাছে এখনো সব তথ্য নেই।
নেপালের লাসায় কনসাল জেনারেল লক্ষ্মীপ্রসাদ নিরৌলা বলেছেন, বন্যায় যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক ও ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সীমান্তে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেছেন, চীনা কর্তৃপক্ষও বন্যার সঠিক কারণ ও উৎপত্তিস্থল নিশ্চিত করতে পারেনি। হিমবাহ ধসের সম্ভাবনা থাকলেও বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
এর আগে, গত বছরের জুলাইয়েও একই অঞ্চলে একটি হিমবাহ ভেঙে আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। রাসুওয়াগাধি সীমান্ত পয়েন্টের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উজানে ওই ঘটনা ঘটে। বন্যায় অন্তত ১১ জন নিহত হন এবং রাসুওয়াগাধির মিতেরি সেতু পুরোপুরি ভেসে যায়।
ওই ঘটনার পর নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসের তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। হিমবাহ ভেঙে বন্যার সম্ভাব্য ঝুঁকিও একে অপরকে জানানোর কথা ছিল। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।
নেপালের দুর্যোগপ্রবণ সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনায় আবারও আগাম সতর্কতা ও সীমান্তপারের তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। বন্যার আশঙ্কায় ভোতে কোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীরের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সতর্কতা জারি করেছে নেপাল সরকার।
সূত্র : রয়টার্স, এনডিটিভি এবং কাঠমান্ডু পোস্ট








