পরমাণু বোমাতেই নিজেদের অস্তিত্ব দেখছে উ. কোরিয়া
- যুক্তরাষ্ট্রের শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য হওয়ার সম্ভাবনা কমানোর প্রচেষ্টা

এআই নির্মিত ছবি
আরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে উত্তর কোরিয়া। এ বিষয়ে দেশটির সক্ষমতাও বেড়েছে অনেক বেশি। এ ঘটনা আরেকটি ইঙ্গিত দেয় যে, উত্তর কোরিয়ার নেতারা তাদের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার করতে চাইছে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। ধারণা করা হয়, উত্তর কোরিয়া তৈরি করেছে প্রায় ৫০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড।
বুধবার দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল সফরে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি নিশ্চিত করেন, উত্তর কোরিয়ার প্রধান পারমাণবিক কমপ্লেক্স ইয়ংবিয়নে কার্যক্রম দ্রুত বৃদ্ধির বিষয়টি।
গ্রোসির ভাষ্য, ইয়ংবিয়নের ৫ মেগাওয়াট রিয়্যাক্টর, পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ইউনিট, লাইট ওয়াটার রিয়্যাক্টর এবং অন্যান্য স্থাপনায় বেড়েছে কর্মযজ্ঞ। ধারণা করা হচ্ছে, দেশটির কাছে রয়েছে কয়েক ডজন পারমাণবিক ওয়ারহেড।
যদিও কিছু বিশেষজ্ঞ এই দাবির ব্যাপারে সন্দিহান যে, দেশটি এগুলোকে এত ছোট করতে সক্ষম হয়েছে- যাতে সেগুলো সংযুক্ত করা যায় দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে।
তবে আরেক দলবিশেষজ্ঞ মনে করেন, ২০০৬ সালে প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর পর থেকে পিয়ংইয়ংয়ের শাসনব্যবস্থা অর্জন করেছে একটি কার্যকর পারমাণবিক সক্ষমতা। এর মধ্যে রয়েছে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম), যা পৌঁছাতে সক্ষম যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড পর্যন্ত।
২০১১ সালে নেতা হওয়া কিম জং-উনের অধীনে উত্তর কোরিয়া জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ত্বরান্বিত করেছে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি। এটি পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা একদিন শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য হওয়ার সম্ভাবনা কমানোর একটি প্রচেষ্টা।
এদিকে গ্রোসির সফরকালে একটি মার্কিন থিংকট্যাংক জানায় যে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য ইয়ংবিয়নে একটি ভবনের নির্মাণকাজ সম্ভবত সম্পন্ন করেছে উত্তর কোরিয়া।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ‘বিয়ন্ড প্যারালাল’ এই সপ্তাহে জানায়, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, নতুন স্থাপনাটি কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতির কাছাকাছি। থিংকট্যাংকটি আরও জানায়, ইয়ংবিয়নে সন্দেহভাজন নতুন সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা এবং পিয়ংইয়ংয়ের কাছে কাংসন এলাকার আরেকটি স্থাপনার তথ্য দেওয়া হয়নি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক কর্তৃপক্ষের কাছে। তাদের ভাষ্য, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন ‘উত্তর কোরিয়ার হাতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বাড়িয়ে দেবে উল্লেখযোগ্যভাবে।’
এই প্রতিবেদন গত বছরের জুনে আইএইএর দেওয়া মূল্যায়নের সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে বলা হয়েছিল, পিয়ংইয়ং ইয়ংবিয়নে একটি সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরি করছে, যা ব্যবহার করা যেতে পারে অস্ত্রের উপাদান উৎপাদনে।
গত মার্চে, গ্রোসি মন্তব্য করেন, উত্তর কোরিয়ার প্রধান পারমাণবিক পরীক্ষাকেন্দ্র পুংগিয়ে-রিতে ‘উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের’ কোনো প্রমাণ নেই। তবে তিনি যোগ করেন, এটি এখনো সক্ষম পারমাণবিক পরীক্ষা চালাতে।
গ্রেসি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেন এবং জানান সংস্থাটি বজায় রেখেছে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি যাচাইয়ের জন্য তার অপরিহার্য ভূমিকা পালনের প্রস্তুতিও।
উত্তর কোরিয়া ২০১৭ সালের পর থেকে কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়নি, তবে তারা ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে অগ্রগতি প্রদর্শন করেছে এবং বাড়িয়েছে অস্ত্রের মজুদ। এগুলো গত আগস্টে কিমের ‘পারমাণবিকীকরণের দ্রুত সম্প্রসার’ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে আনার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হয়েছে ব্যর্থ। এর জন্য দায়ী করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কিমের সঙ্গে ব্যর্থ শীর্ষ বৈঠক এবং পিয়ংইয়ং ও সিউলের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি।
এই বছরের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং জানান, উত্তর কোরিয়া প্রতিবছর ১০ থেকে ২০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য উৎপাদন করছে যথেষ্ট উপাদান। পাশাপাশি উন্নত করছে তাদের দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিও।
লি জানুয়ারিতে আরও যোগ করেন, কোনো একসময়ে উত্তর কোরিয়া এমন একটি পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার নিশ্চিত করবে, যা তারা প্রয়োজন বলে মনে করে শাসন টিকিয়ে রাখতে। সঙ্গে থাকবে এমন আইসিবিএম সক্ষমতা, যা শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, পুরো বিশ্বকেও ফেলতে পারে হুমকির মুখে। একবার অতিরিক্ত হয়ে গেলে তা ছড়িয়ে পড়বে তাদের সীমান্তের বাইরে। তখন সৃষ্টি হবে একটি ‘বৈশ্বিক বিপদ’।
এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সীমান্ত সংলাপ আবার শুরু করার প্রচেষ্টাও প্রত্যাখ্যান করেছে উত্তর কোরিয়া।
তথ্যসূত্র : গার্ডিয়ান

