বন্যা থেকে বাঁচতে গাছে উঠেছিল ৮ বছরের শিশু, অবশেষে মায়ের কোলে

হাসপাতালে ছেলের সঙ্গে মা তামাংয়। ছবি: রয়টার্স
নেপালের রাসুয়ায় অন্যদিনের মতোই স্কুলে ক্লাস করছিল ৮ বছরের শিশু জোয়াল ঘালে। হঠাৎ চারদিকে অন্ধকার মনে হলো তার। এক বন্ধুর সঙ্গে সে ছুটতে শুরু করল জঙ্গলের দিকে। তারপর দ্রুত উঠে গেল একটি গাছে। আর তাতেই প্রাণ বেঁচেছে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা থেকে। আর ছেলেকে জীবিত খুঁজে পেয়ে স্বস্তি ফিরেছে মা মত্তি মায়া তামাংয়ের মনে।
পরিবারটি খুবই অল্প সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একটি যারা দুর্যোগ কবলিত হয়েও জীবিত ফিরে পেয়েছে স্বজনকে। নেপাল ও চীনের তিব্বতে বুধবারের বন্যায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫৮০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন। কাঠমান্ডুর উত্তরে রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলায় বন্যায় অন্তত ১৭ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।
অন্যদিনের বুধবার সকালে তামাংয়ের দুই ছেলে স্কুলের গাড়িতে করে স্কুলে যায়। বাড়িতে বসে তাঁত বুনছিলেন তামাং। হঠাৎ তিনি ভূমিকম্পের মতো একটি শব্দ শুনতে পান। তামাং বলছিলেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। আমি ভাবছিলাম, আমার সন্তানরাও ভেসে যাচ্ছে।’
দ্রুত তিনি ছেলের স্কুলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সাধারণত সেখানে গাড়িতে যেতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। তিনি জানান, ততক্ষণে এলাকার দৃশ্য চেনাই যাচ্ছিল না। স্কুল ভবনটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ‘কোথায় স্কুল ছিল, কোথায় বাজার ছিল, তা বোঝার উপায় ছিল না। চারদিকে শুধু পানি, পাথর আর কাদা।’
সেখানে গিয়ে তিনি সন্তানদের খুঁজে পাননি। তারপর ছুটতে থাকেন এক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আরেক আশ্রয়কেন্দ্রে। রয়টার্সকে তামাং বলেছেন, ‘চতুর্থ আশ্রয়কেন্দ্রের তালিকায়ও আমার সন্তানদের নাম ছিল না, তারাও ছিল না সেখানে। আমি মেনে নিতে শুরু করেছিলাম যে আমার দুই সন্তানই আর বেঁচে নেই। আমি শুধু কাঁদছিলাম। নিজেকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছিলাম না।’
একদিকে যখন ছেলের সন্ধানে দিগ্বিদিক ছুটছিলেন তামাং, তখন জোয়ালকে বন্যা বিধ্বস্ত উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রাসুয়া থেকে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা হয়। তার একটি পা ভেঙে গিয়েছিল এবং মুখে ছিল কাটা-ছেঁড়ার দাগ।
যেভাবে খুঁজে পেলেন ছেলেকে
একটি শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে তবে তার পরিবারের খোঁজ পাওয়া যায়নি এমন তথ্য জানতে পারে রয়টার্স। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে পার্শ্ববর্তী নুওয়াকোট জেলার একটি ছোট হাসপাতালে জোয়ালের সঙ্গে দেখা করেন রয়টার্সের সাংবাদিক সাহানা বজ্রাচার্য ও তার দল।
আহত জোয়ালের সঙ্গে সেখানে কথা বলেন তারা। উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়ার আগে শিশুটির ভিডিও করেন তারা। সেখানে হাসপাতালে নিজের নম্বর রেখে আসেন বজ্রাচার্য। এর কয়েক ঘণ্টা পর তাকে ফোন করেন তামাং। বজ্রাচার্য তাকে জানান, জোয়াল বেঁচে আছে এবং তাকে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে।
তামাং বলছিলেন, ‘আপনি যখন বললেন যে জোয়াল কোথায় আছে, কথাটি সত্যি মনে হচ্ছিল না। আমি ধরেই নিয়েছিলাম, আমি তাদের আর খুঁজে পাব না।’ এর আগেই অবশ্য ছোট ছেলেকে জীবিত খুঁজে পেয়েছিলেন তামাং। ‘বড় ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার পর মনে হলো, আমার জীবন ফিরে পেয়েছি’, বলছিলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সকালে নুওয়াকোটের ওই হাসপাতালে যখন জোয়ালের সঙ্গে দেখা করেন বজ্রাচার্য, তখন তার পরিবারের বিষয়ে কোনো খোঁজ ছিল না।
জোয়ালের ডান পা ভেঙে গিয়েছিল এবং মুখে ছিল আঁচড় ও আঘাতের চিহ্ন। তবে সে বাঁ হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছিল ১০ রুপির দুটি নোট। কর্মকর্তারা জানালেন, তাকে উদ্ধার করা পুলিশ সদস্যরা তাকে হাসপাতাল যেতে রাজি করাতে ওই টাকাগুলো দিয়েছিলেন।
রয়টার্সকে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন জোয়াল। তার ভাষ্য, বন্যা আঘাত হানার সময় আমি স্কুলে ক্লাস করছিলাম। হঠাৎ ‘সবকিছু এত, এত অন্ধকার’ হয়ে গেল। শিশুটি জানায়, এক বন্ধুর সঙ্গে স্কুল থেকে জঙ্গলের দিকে দৌড়ে যায় সে। বাঁচার জন্য উঠে পড়ে একটি গাছে।
শুক্রবার তামাং শেষ পর্যন্ত কাঠমান্ডুর সেই হাসপাতালে পৌঁছান, যেখানে উন্নত চিকিৎসার জন্য জোয়ালকে নেওয়া হয়েছিল। কয়েকদিন খোঁজার পর ছেলেকে পেয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন ছেলের পাশে। জাপানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করা জোয়ালের বাবাও সেখানে আসছিলেন বলে জানালেন তামাং।
বুধবারের বন্যা অনেকের মতো তামাংয়ের জীবনও বদলে দিয়েছে। তবে দুই ছেলেকে জীবিত ফিরে পেয়ে ইতিমধ্যেই স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে।











