ভেসে আসা মরদেহে দিশাহারা নেপাল
- মর্গে ফুরিয়ে এসেছে জায়গা

সবুজ প্রকৃতির মাঝ দিয়ে বয়ে চলা নদীর দুকূল ধরে এখন শুধুই কাদামাটির ধ্বংসস্তূপ। চারদিকে বিধ্বস্ত দালান, সেতু, রাস্তা আর নানা অবকাঠামো। দুদিন আগেও পর্যটকের ভিড়ে প্রাণবন্ত নুয়াকোট অঞ্চল পরিণত হয়েছে লাশের ভূমিতে। ভোটেকোশী নদীর বন্যায় অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে আসছে মানুষের মৃতদেহ। তাদের সংরক্ষণ-শনাক্তকরণের জায়গা খুঁজে পেতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। চিতওয়ান ও পোখারা অঞ্চলের হাসপাতালগুলোয় পূর্ণ হয়ে আসছে মর্গের ধারণক্ষমতা।
দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে গতকাল শুক্রবার বলা হয়েছে, এসব এলাকায় মর্গে জায়গা ফুরিয়ে আসায় প্রতিবেশী অঞ্চলে সংরক্ষণের জন্য পাঠানো হচ্ছে অনেক মরদেহ।
দক্ষিণ-মধ্য নেপালের অন্যতম জনপ্রিয় শহর চিতওয়ান। সেখানে উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে হাসপাতালের ধারণক্ষমতা। এই অবস্থায় ভরতপুরে একটি অস্থায়ী কেন্দ্র প্রস্তুত করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্যুৎ রোডে অবস্থিত ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’-এর একটি অব্যবহৃত ভবনকে এই অস্থায়ী কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। গত বৃহস্পতিবার চিতওয়ানের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার (জেলা প্রশাসক) গণেশ আরিয়ালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ কেন্দ্রটি চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আরিয়াল জানালেন, চিতওয়ানের হাসপাতালগুলোর মর্গে সব মিলিয়ে একবারে ৩০-৫০টি মৃতদেহ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই ধারণক্ষমতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হওয়ায়, এই অস্থায়ী কেন্দ্রটি প্রায় ২৫০টি মৃতদেহ রাখার মতো জায়গা করে দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ভরতপুর মেট্রোপলিটন সিটি এই অস্থায়ী কেন্দ্রটির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সাজসজ্জার কাজ করবে। কক্ষের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) স্থাপন এবং মৃতদেহের পচনপ্রক্রিয়া ধীর করতে ড্রাই আইস ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে কর্তৃপক্ষ। যদি সেই ধারণক্ষমতাও ছাড়িয়ে যায়, তবে কর্তৃপক্ষ বিকল্প হিসেবে দেবঘাটের বৈদ্যুতিক শ্মশানটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পোখারা শহরের হাসপাতালগুলোও জানিয়েছে, বিভিন্ন জেলা থেকে মৃতদেহ আসতে থাকায় তাদের মর্গে আর জায়গা হচ্ছে না। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ত্রিশূলি ও নারায়ণী নদীর চিতওয়ান অংশে, ফিশলিং থেকে গোলাঘাট পর্যন্ত, ১৩৭টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
চিতওয়ানে স্বজনদের ভিড়: ক্ষতিগ্রস্ত সব অঞ্চলেই চলছে উদ্ধার তৎপরতা। এরই ধারাবাহিকতায় আপনজনদের খুঁজতে রাসুয়া, নুয়াকোট, গোরখাসহ অন্যান্য জেলা থেকে চিতওয়ানে আসতে শুরু করেছেন স্বজনরা।
হাজারো উদ্বিগ্ন আত্মীয়ের মধ্যে প্রচণ্ড গরমে একটি তাঁবুর নিচে বসে অপেক্ষা করছিলেন ইয়ামান বানু। তিনি তার দাদি ও নানির খোঁজে এখন চিতওয়ানে। বানু জানালেন, তার দাদি সাকলা এবং নানি নাজাবুন নিশা— উভয়েই এখনো নিখোঁজ। তারা নুয়াকোটের ত্রিশূলি বাজারে থাকতেন এবং বন্যার পর থেকে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
পোখারার মর্গে আর জায়গা নেই: ভোটেকোশী নদীর বন্যায় ভেসে আসা মৃতদেহে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে পোখারার মর্গগুলোও। প্রতিবেশী বিভিন্ন জেলায় জায়গা না হওয়ায় মৃতদেহগুলোকে নিয়ে আসা হয়েছে পোখারায়। তানাহুন, গোরখা, নাওয়ালপরাসি পূর্ব এবং ধাদিং থেকে ৯৩টি মৃতদেহ এই শহরে আনা হয়েছে। কাস্কির প্রধান জেলা কর্মকর্তা কুমার সিং গুরুং জানিয়েছেন, পোখারা একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সেসসহ জেলার হাসপাতালগুলোয় ৮৮টি মৃতদেহ রাখার সক্ষমতা রয়েছে।
অশনাক্ত লাশ শনাক্তের প্রস্তুতি কর্তৃপক্ষের: ‘অশনাক্ত ও দাবিহীন মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা, ২০২১’ অনুযায়ী, জেলা পুলিশপ্রধানের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি মৃতদেহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে বলে জানিয়েছেন কাস্কি জেলার পুলিশ সুপার নবীন কার্কি। মরদেহ শনাক্তে পুলিশ প্রথমে মৃতদেহগুলোর ছবি তোলে, আঙুলের ছাপ নেয়, ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে। যেসব ক্ষেত্রে মুখের অবয়ব দেখে শনাক্ত করা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে ছবি প্রকাশ করা হয়, যাতে স্বজনরা তাদের আত্মীয়দের শনাক্ত করতে পারেন। কার্কি বললেন, ‘যদি স্বজনদের খুঁজে পাওয়া না যায় বা মৃতদেহ শনাক্ত করা সম্ভব না হয়, তবে আমরা সেগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সংরক্ষণ করে রাখতে পারি না; কারণ আগেই আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে।’







