দুঃসময়ে এক দেশ এক হৃদয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বন্যার জল যখন ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তখন বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ভাষা আর আলাদা থাকে না। ভোটেকোশীর ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত নেপাল যেন সেই কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিল— দুঃসময়ে এক দেশ, এক হৃদয়। ছাত্ররা তুলে দিচ্ছে নিজের টিফিনের টাকা, কেউ ঘরে জমানো সঞ্চয়, কেউ আবার তিজের উৎসবের (শিব-পার্বতীর পুনর্মিলন) আয়োজন পর্যন্ত স্থগিত করে সেই অর্থ দিয়েছেন বন্যার্তদের জন্য। গত বুধবার পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দৈবী দুর্যোগ উদ্ধার তহবিলে ডিজিটাল মাধ্যমেই ১০ লাখ ৬২ হাজার ৭৮টি লেনদেনে ৫১৮ কোটি ৭৫ লাখ নেপালি রুপি জমা পড়েছে। ভোটেকোশী বন্যার পর নেপাল জুড়ে মানুষের এই অভূতপূর্ব সাড়া কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল, তার বিস্তারিত ছবি উঠে এসেছে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে। প্রায় ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের দানের হাত বাড়িয়েছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে।
নেপালের আচাম জেলার মঙ্গলসেন পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ষোড়শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে ১৪ হাজার ২৫৫ নেপালি রুপি ত্রাণ তহবিলে দিয়েছেন। কাপিলবস্তুর ধর্মপনিয়ার জাতীয় জনহিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা দিয়েছে ১০ হাজার ৫০ রুপি। রৌতহট জেলার দেবাহী গোনাহি পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের প্রেমপুর গোনাহি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিয়েছে। তারা ত্রাণ তহবিলে ৪৭০ নেপালি রুপি জমা করেছে। অন্যদিকে, মকওয়ানপুর জেলার থাহা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের অধিকারী বংশজ মহিলা গোষ্ঠী তিজের ‘দর’ অনুষ্ঠান বাতিল করেছে। অনুষ্ঠানের জন্য রাখা ৫০ হাজার ৫৫৫ নেপালি রুপিও তুলে দিয়েছে ত্রাণ তহবিলে।
এই সহায়তার পরিধি স্কুল, পাড়া বা কয়েকটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নেপালের গ্রাম থেকে শহর, এমনকি বিদেশে থাকা নেপালিরাও ভোটেকোশী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য অর্থ পাঠাচ্ছেন। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে থাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের হিসাবে প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি রুপি জমা পড়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে বিভিন্ন বৈদ্যুতিন মাধ্যমে ৫১৮ কোটি ৭৫ লাখ এবং বিদেশি মুদ্রায় আরও প্রায় ১০৮ কোটি রুপির সমপরিমাণ অর্থ এসেছে।
বন্যার পর সরকার মানুষকে ত্রাণ তহবিলে অর্থ দেওয়ার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে অর্থ পাঠানোর পথও সহজ করা হয়। ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি কিউআর কোডে অর্থ পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিদেশি মুদ্রায় অনুদান গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয় এবং ত্রাণের অর্থে কর আরোপ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ত্রাণসামগ্রী আমদানির ক্ষেত্রেও শুল্ক ও অন্যান্য কিছু ফি মওকুফ করা হয়েছে। নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংকও ত্রাণ তহবিলে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিন লেনদেনের সীমা তুলে দেয়। ফলে ই-সেবা, খলতিসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেট এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এই ছোট ছোট অনুদানই বড় অঙ্কে পৌঁছেছে। ই-সেবার মাধ্যমে ৯ কোটির বেশি রুপি জমা পড়েছে। তাদের হিসাবে প্রায় দেড় লাখ লেনদেনের মধ্যে প্রায় ৬৬ হাজার অনুদানদাতা ১০০ রুপিরও কম দিয়েছেন। সবচেয়ে কম অনুদান ছিল ১০ রুপি। অর্থাৎ ছাত্র, গৃহিণী, চালক, রাইড শেয়ারিং কর্মী এবং ছোট ব্যবসায়ীদের সামান্য সামান্য অর্থও ত্রাণ তহবিলের বড় স্রোতের অংশ হয়েছে। ফোন-পের মাধ্যমেও বিপুল অর্থ এসেছে। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৮ লাখ ৩২ হাজার ৪৮৯টি লেনদেনে ২০৭ কোটি ৯৯ লাখ রুপি জমা পড়ে। এর মধ্যে ১৯৮ কোটি ৮১ লাখ এসেছে দেশীয় কিউআর ব্যবস্থায়। ফোন-পের হিসাবে এক দিনে সর্বোচ্চ ৭৩ কোটি ৩৫ লাখ রুপি জমা পড়েছিল। ভারত থেকে এনপিসিআই ব্যবস্থায় এবং আলিপে প্লাসের মাধ্যমেও অর্থ এসেছে। বিদেশে থাকা নেপালিরাও পিছিয়ে নেই। আইএমই মানি ট্রান্সফারের মাধ্যমে প্রায় ১৮ হাজার লেনদেনে ১৮ কোটি ২০ লাখ ৯১ হাজার রুপি এসেছে। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থ এসেছে আমেরিকা থেকে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ সেখান থেকে অর্থ পাঠিয়েছে। এরপর রয়েছে পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিদেশ থেকে অনুদান পাঠাতে রেমিট্যান্স সংস্থাগুলো পরিষেবা শুল্কও তুলে দিয়েছে।
বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর এই স্রোত শুধু অর্থের অঙ্কে মাপা যায় না। মকওয়ানপুরের মহিলা গোষ্ঠীর সদস্য উমা অধিকারী বলেছেন, তিজ নেপালের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও দেশের মানুষ যখন বিপদে, তখন উৎসবের আনন্দের চেয়ে সাহায্য করাকেই নিজেদের কর্তব্য মনে করেছেন তারা।





