এশিয়া জেনারেল বদলান, নীতি বদলায় না
চীনা সেনাবাহিনীর লাগাম কেন কমিউনিস্ট পার্টির হাতেই? দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে একের পর এক শীর্ষ জেনারেলের পতন তাইওয়ান ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেও বেইজিংয়ের প্রথম শর্ত: বাহিনীর নিঃশর্ত রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ২৩:০৬
ছবি: রয়টার্স
সেনাবাহিনীর হাতে বন্দুক থাকবে। কিন্তু সেই বন্দুকের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে কার হাতে ? চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কাছে প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই প্রশ্নের উত্তর একটাই , পার্টির হাতে।
১৯৩৮ সালে মাও সে তুং লিখেছিলেন , দলের নীতি হলো , “ পার্টি বন্দুককে নির্দেশ দেবে ; বন্দুককে কখনও পার্টিকে নির্দেশ দিতে দেওয়া যাবে না। ” তারও প্রায় এক দশক আগে , ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে ফুজিয়ান প্রদেশের গুতিয়ানে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে কমিউনিস্টদের সশস্ত্র বাহিনীকে বিপ্লবের
সর্বশেষ সংবাদ সর্বাধিক পঠিত
রাজনৈতিক
লক্ষ্য
বাস্তবায়নের
অস্ত্র
হিসেবে
সংজ্ঞায়িত
করা
হয়েছিল।
সেনাবাহিনীর
প্রতিটি
স্তরে
পার্টির
সংগঠন
প্রতিষ্ঠার
ভিত্তিও
তৈরি
হয়
সেখানেই।
তারপর পেরিয়ে গেছে প্রায় এক শতাব্দী। মাও নেই , চীন বদলে গেছে , পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ এখন বিশ্বের বৃহত্তম ও দ্রুত আধুনিকায়নশীল সামরিক শক্তিগুলোর একটি। কিন্তু একটি নীতি বদলায়নি , সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের কোনো স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান নয় ; তার রাজনৈতিক আনুগত্য থাকবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি। আর শি জিনপিংয়ের আমলে সেই পুরোনো নীতিই ফিরে এসেছে আরও কঠোর রূপে।
১৯২৯ সালের গুতিয়ান সম্মেলনের সময় কমিউনিস্ট বাহিনী ছিল বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহী ও কৃষকযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গড়া এক সশস্ত্র শক্তি। সামনে ছিল চিয়াং কাইশেকের কুওমিনতাং বাহিনী। শৃঙ্খলা , নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক লক্ষ্য – তিন ক্ষেত্রেই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
গুতিয়ানের সিদ্ধান্ত সেই বাহিনীকে শুধু যুদ্ধের সংগঠন হিসেবে রাখেনি। বরং স্থির হয়েছিল , সামরিক শক্তি হবে পার্টির রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার। পরবর্তী দুই দশকে লং মার্চ , মাওয়ের নেতৃত্বের সংহতি এবং গৃহযুদ্ধে কমিউনিস্টদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই কাঠামোই বিকশিত হয়ে ১৯৪৯ সালে পিপলস লিবারেশন আর্মিতে রূপ নেয়।
এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে চীনা কমিউনিস্ট নেতৃত্ব যে শিক্ষা নিয়েছে , তা খুব সরল : অস্ত্রধারী বাহিনী যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে স্বাধীন হয়ে ওঠে , তাহলে সেই বাহিনীই একদিন ক্ষমতার জন্য হুমকি হতে পারে। তাই বেইজিংয়ের চোখে সামরিক দক্ষতার আগে আসে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ।
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর শি জিনপিং পিএলএ - র উপর পার্টির নিয়ন্ত্রণকে নিজের সামরিক সংস্কারের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
২০১৪ সালের অক্টোবরে তিনি শত শত শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে নিয়ে আবার গুতিয়ানে যান। সেই রাজনৈতিক কর্মসম্মেলনে তার বক্তব্য ছিল স্পষ্ট , চীনা সেনাবাহিনী কমিউনিস্ট পার্টির ‘ নিরঙ্কুশ নেতৃত্বে ’ থাকবে এবং “ পার্টিই বন্দুককে নির্দেশ দেবে। ”
সেই সময় পিএলএ - র ভেতরে দুর্নীতি , পদ কেনাবেচা , স্বজনপ্রীতি এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ার অভিযোগ ছিল ব্যাপক। সাবেক সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন ভাইস - চেয়ারম্যান শু চাইহৌয়ের বিরুদ্ধে বিপুল ঘুষের বিনিময়ে পদোন্নতির ব্যবস্থা করার অভিযোগ ওঠে। শি এই ঘটনাগুলোকে শুধু দুর্নীতি হিসেবে দেখেননি ; তার দৃষ্টিতে এগুলো ছিল রাজনৈতিক আনুগত্য ক্ষয়ে যাওয়ার লক্ষণ।
অর্থাৎ পিএলএ - কে পরিষ্কার করার অভিযানে ‘ দুর্নীতি ’ এবং ‘ আনুগত্য ’, দুটি বিষয় ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
২০২৪ সালের জুনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক রাজনৈতিক কর্মসম্মেলন ডাকেন শি। জায়গা এবার ইয়ানআন , মাওয়ের বিপ্লবী আন্দোলনের আরেক ঐতিহাসিক কেন্দ্র।
সেখানে শি বলেন , সেনাবাহিনীর ‘ রাজনৈতিক আনুগত্য ’ নিশ্চিত করতে হবে এবং বাহিনীর নেতৃত্বে এমন কর্মকর্তাদের রাখতে হবে , যাঁরা পার্টির প্রতি বিশ্বস্ত , সৎ ও দায়িত্বশীল। তিনি ঘোষণা করেন , সেনাবাহিনীতে দুর্নীতির কোনো জায়গা নেই। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার ভাষায় , ২০১৪ সালের গুতিয়ান সম্মেলনের দশ বছর পর ইয়ানআনের সম্মেলন ছিল পিএলএ - র রাজনৈতিক কাজকে আবারও ‘ মূল শিকড়ে ’ ফেরানোর চেষ্টা।
এই রাজনৈতিক কাঠামোয় পিএলএ - র সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন। তার চেয়ারম্যান শি নিজেই। অর্থাৎ তিনি শুধু রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা পার্টির সাধারণ সম্পাদক নন ; সামরিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ কেন্দ্রেও তার অবস্থান।
কিন্তু পার্টির প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করতে এক দশকের বেশি সময় ধরে অভিযান চালানোর পরও পিএলএ - র সর্বোচ্চ পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ থামেনি।
বরং ২০২৩ সাল থেকে শুদ্ধি অভিযান আরও গভীরে পৌঁছায়। পরমাণু ও প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের দায়িত্বে থাকা অভিজাত রকেট ফোর্সের শীর্ষ নেতৃত্বে ব্যাপক রদবদল হয়। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লি শাংফুও দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হন।
তারপর ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের ভাইস - চেয়ারম্যান হ্য ওয়েইদংকে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে চলতি বছরের জানুয়ারিতে। শি জিনপিংয়ের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী , সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের জ্যেষ্ঠ ভাইস - চেয়ারম্যান এবং চীনের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ঝাং ইউশিয়াকে তদন্তের আওতায় আনা হয়। তাঁর সঙ্গে তদন্ত শুরু হয় সিএমসির জয়েন্ট স্টাফ বিভাগের প্রধান লিউ ঝেনলির বিরুদ্ধেও। অভিযোগ , ‘ শৃঙ্খলা ও আইন গুরুতরভাবে লঙ্ঘন ’ ।
এই পদক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ আরেকটি কারণে। ঝাং শুধু শীর্ষ জেনারেল নন , শি ’ র ঘনিষ্ঠ বলেও দীর্ঘদিন পরিচিত ছিলেন। তাঁদের দুজনই চীনের বিপ্লবী নেতৃত্বের পরিবারের সন্তান।বতবু ছাড় পাননি ঝাং। বিশ্লেষকদের ভাষায় , বার্তাটি পরিষ্কার – ঘনিষ্ঠতা কোনো রক্ষাকবচ নয়।
শুদ্ধি অভিযানের মাত্রা বোঝার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের বর্তমান অবস্থা। সাধারণত সাত সদস্যের এই সর্বোচ্চ সামরিক নেতৃত্বকাঠামোয় ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ কার্যত সক্রিয় ছিলেন মাত্র দুজন , চেয়ারম্যান শি জিনপিং এবং সদ্য উন্নীত ভাইস - চেয়ারম্যান ঝাং শেংমিন।
ঝাং শেংমিন নিজে মূলত রাজনৈতিক কমিশার এবং সামরিক দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে , যুদ্ধ বা বড় নিরাপত্তা সংকটের মুহূর্তে শি কাদের কাছ থেকে স্বাধীন ও পেশাদার সামরিক পরামর্শ নেবেন ?
ঝাং ইউশিয়ার পতনের পর সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা রয়টার্সকে বলেছেন , তিনি ছিলেন পিএলএ - র হাতে গোনা কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার একজন , যাঁর বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল। ১৯৭৯ সালের চীন - ভিয়েতনাম সংঘাতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর অনুপস্থিতি সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভিজ্ঞ মতামতের ঘাটতি তৈরি করতে পারে।
শি ’ র ভয় : দুর্নীতি , না আনুগত্যহীনতা ?
এই প্রশ্নটির উত্তর সম্ভবত দুটিই।
চীনের সামরিক দুর্নীতির বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম। পদোন্নতি , অস্ত্র কেনাকাটা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ বহু বছর ধরেই সামনে এসেছে।
কিন্তু শি ’ র কাছে দুর্নীতি কেবল অর্থের সমস্যা নয়। দুর্নীতিগ্রস্ত জেনারেল মানে এমন কর্মকর্তা , যার আনুগত্য পার্টির বদলে ব্যক্তিগত স্বার্থ , অর্থ বা নিজস্ব গোষ্ঠীর প্রতি চলে যেতে পারে।
এই কারণেই ‘ দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ’ একই সঙ্গে হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক আনুগত্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া।
জানুয়ারিতে ঝাং ইউশিয়া ও লিউ ঝেনলির বিরুদ্ধে তদন্ত ঘোষণার পর পিএলএ ডেইলি অভিযোগ করেছিল , তাঁরা শি - কেন্দ্রিক ‘ চেয়ারম্যান রেসপনসিবিলিটি সিস্টেম ’ গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন করেছেন। এই ব্যবস্থায় সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে সর্বোচ্চ সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা শি ’ র হাতে কেন্দ্রীভূত।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে , অভিযোগের এই ভাষা শুধু আর্থিক দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয় না ; ক্ষমতা ও আনুগত্যের প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
মার্চে শি ’ র নতুন সতর্কবার্তা
চলতি বছরের ৭ মার্চ চীনের বার্ষিক ‘ দুই অধিবেশন ’ চলাকালে পিএলএ ও সশস্ত্র পুলিশের প্রতিনিধিদের সামনে আবারও একই বার্তা দেন শি।
সেনাবাহিনীকে অবশ্যই কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি রাজনৈতিকভাবে অনুগত থাকতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান থামবে না। তাঁর ভাষায় , দুর্নীতির “ লুকিয়ে থাকার কোনো জায়গা নেই। ”
আর গত শুক্রবার ( ৩১ জুলাই ) পিএলএ - র ৯৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ঠিক আগে , পলিটব্যুরোর এক বৈঠকে শি মাওয়ের পুরোনো নীতিটিই নতুন করে উচ্চারণ করেন , “ বন্দুকের নলকে সব সময় পার্টির নির্দেশ মানতে হবে। ” একই সঙ্গে সামরিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও গভীর অভিযান এবং প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দেন তিনি। প্রায় এক শতাব্দীর ব্যবধানে ভাষা বদলেছে সামান্য , মূল বার্তা নয়।
কিন্তু এত শুদ্ধি অভিযানে যুদ্ধক্ষমতা কি কমছে ?
এখানেই শি ’ র সামরিক নীতির সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। একদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অনুগত নয় , এমন কর্মকর্তাদের সরিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আরও দক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য বাহিনী তৈরি করা সম্ভব। অন্যদিকে , একের পর এক শীর্ষ কমান্ডার সরিয়ে দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ , যৌথ মহড়া এবং যুদ্ধ প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ফেব্রুয়ারির এক মূল্যায়নের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে , দীর্ঘ শুদ্ধি অভিযান পিএলএ - র যুদ্ধ প্রস্তুতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং কমান্ড কাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।
তবে বেইজিং একই সঙ্গে আধুনিকায়নও থামাচ্ছে না।
চলতি বছর সালে চীন প্রতিরক্ষা বাজেট ৭ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ১ দশমিক ৯১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান , অর্থাৎ প্রায় ২৭৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। লক্ষ্য , ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিক আধুনিকায়নের বড় ধাপ সম্পন্ন করা।
শি আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা , চালকবিহীন ব্যবস্থা এবং সাইবার - তথ্যনির্ভর যুদ্ধব্যবস্থার উপর জোর দিচ্ছেন। তার ভাষায় , আধুনিকায়নের শেষ মাপকাঠি হবে যুদ্ধক্ষমতা।
অর্থাৎ তার সমীকরণ , প্রযুক্তি , যুদ্ধক্ষমতা , ও নিঃশর্ত আনুগত্য।
এই অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান এমন সময়ে চলছে , যখন চীনের সেনাবাহিনীকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রশ্ন তাইওয়ান।
বেইজিং স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের অধিকার ছাড়েনি। চীনা যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক বিমান প্রায় প্রতিদিনই দ্বীপটির আশপাশে তৎপরতা চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মূল্যায়নে আগে বলা হয়েছিল , চীনা নেতৃত্ব চায় পিএলএ ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ানসংক্রান্ত সংঘাতে জয়ের সক্ষমতা অর্জন করুক। তবে সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে , বেইজিং ২০২৭ সালেই আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমন প্রমাণ নেই ; সম্ভব হলে বলপ্রয়োগ ছাড়াই তাইওয়ানকে নিয়ন্ত্রণে আনাই তাদের পছন্দ।
জেনারেলদের সাম্প্রতিক পতন নিয়ে কয়েকজন বিশ্লেষকের ধারণা , এতে নিকট ভবিষ্যতে বড় সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা বরং কমতে পারে। কারণ , শি এখন বাহিনীর নেতৃত্ব পুনর্গঠন এবং পুরো কমান্ড কাঠামো নিজের আস্থাভাজন ও দক্ষ কর্মকর্তাদের দিয়ে সাজানোর দিকে বেশি মনোযোগী।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার অর্থ উল্টোও হতে পারে , আরও রাজনৈতিকভাবে অনুগত , আরও প্রযুক্তিনির্ভর এবং আরও যুদ্ধপ্রস্তুত পিএলএ।
কেন এত ভয় ‘ স্বাধীন ’ সেনাবাহিনীকে
পশ্চিমা অনেক দেশে সেনাবাহিনীর আনুগত্য সংবিধান বা রাষ্ট্রের প্রতি। চীনের কাঠামো ভিন্ন। পিএলএ নামের মধ্যেই ‘ জনগণ ’ থাকলেও বাহিনীটি সাংগঠনিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টির সেনাবাহিনী। তার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব রাষ্ট্রীয় সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নয় , কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন। এর পেছনে চীনা কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্মকথাই মূল কারণ।
মাওয়ের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের পথ এসেছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তার বিখ্যাত উপলব্ধি – রাজনৈতিক ক্ষমতা বন্দুকের নল থেকে জন্মাতে পারে ; তাই সেই বন্দুক যেন কখনও পার্টির নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়।
শি জিনপিং প্রায় এক শতাব্দী পরে একই নীতিকে শুধু ধরে রাখেননি , আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করেছেন।
এ বছরের ১ আগস্ট ৯৯ বছর পূর্ণ করেছে পিএলএ৷ আর মাত্র এক বছর পর শতবর্ষ। বেইজিংয়ের সামনে এখন বিরাট লক্ষ্য – বিশ্বমানের সেনাবাহিনী , আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র , নৌবহর , পরমাণু শক্তি , কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা , মহাকাশ ও সাইবার সক্ষমতা।
কিন্তু শি ’ র কাছে এই সব কিছুরও আগে যেন একটি প্রশ্ন – ট্রিগারে আঙুল যার , সে কাকে মানবে ?
১৯২৯ সালের গুতিয়ান থেকে ২০২৬ সালের বেইজিং পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির উত্তর একই৷ সেনাবাহিনীর হাতে বন্দুক থাকবে। কিন্তু বন্দুকের উপর হাত থাকবে পার্টির।