একাকিত্ব দূর করছে, কিন্তু মানবিক বোধ কি কেড়ে নিচ্ছে এআই?

ছবিঃ এআই
আধুনিক যুগে মানুষ যত বেশি প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে, তত বেশি একাকী হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ তীব্র একাকিত্বে ভুগছেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার মতোই ক্ষতিকর।
এই একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে নিয়ে এসেছে এক নতুন সমাধান ‘এআই সঙ্গী’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চ্যাটবট। মাইক্রোসফটের ‘শাওইস’ কিংবা ‘রেপ্লিকা’র মতো চ্যাটবটগুলোর এখন বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি ব্যবহারকারী রয়েছে, যারা এই রোবট বা কোডগুলোকে নিজেদের ‘সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু’ মনে করছেন।
কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে তৈরি এই একতরফা সম্পর্ক মানুষের সমাজ ও মানসিকতার জন্য কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন তুলছেন সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা।
বাস্তবজীবনে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা বেশ কঠিন। সেখানে রাগ, অভিমান, দ্বিমত এবং মানসিক দুর্বলতার জায়গা থাকে। অন্যদিকে, এআই চ্যাটবটগুলোকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে যে তারা কখনোই আপনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবে না, কোনো কঠিন প্রশ্ন করবে না এবং সবসময় আপনার পক্ষ নেবে।
হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘হার’-এ যেভাবে একজন একাকী মানুষকে তার ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্টের প্রেমে পড়তে দেখা গিয়েছিল, বাস্তবেও ঠিক তাই ঘটছে।
গবেষকদের মতে, টাকা দিয়ে কেনা এই নিঃশর্ত ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে আছে একধরনের ‘দাসত্বমূলক মানসিকতা’। আমেরিকার প্রাচীন দাসপ্রথার দিকে তাকালে দেখা যায়, শ্বেতাঙ্গ দাস মালিকরা কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের ওপর তীব্র নির্যাতন করলেও মানসিকভাবে আত্মতৃপ্তি পাওয়ার জন্য তাদের বাধ্য করত হাসিমুখে ভালোবাসার অভিনয় করতে। দাসরা যদি কখনো তাদের কষ্টের আসল সত্য মুখ ফুটে বলত, তবে তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো।
আজকের এআই সঙ্গীরাও ঠিক একইভাবে মানুষের অবচেতন মনের সেই ‘চাটুকারিতা পাওয়ার লোভ’-কে পুঁজি করছে। এআই কখনোই আপনাকে এমন কোনো সত্য কথা বলবে না যা আপনার শুনতে খারাপ লাগে। এর ফলে মানুষের অন্য একজন মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করার এবং ত্যাগ স্বীকার করার স্বাভাবিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে।
বিজ্ঞান হয়তো চমৎকার সব প্রযুক্তি বা চ্যাটবট তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই প্রযুক্তি মানুষের সমাজের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা বোঝার জন্য ইতিহাস, দর্শন ও সাহিত্যের চর্চা অপরিহার্য। দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান যুগে এই মানবিক শিক্ষার অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ টেক কোম্পানিগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে সহজেই পা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের আসল সৌন্দর্যই হলো এর অনিশ্চয়তা ও নমনীয়তা। আপনি যখন অন্য একজন মানুষের সঙ্গে মিশবেন, তার প্রতিক্রিয়া আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। আর এই প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে চিনতে শেখে এবং অন্যকে ভালোবাসতে শেখে।
এআইয়ের যুগে কবিতা, দর্শন ও ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের সত্যিকারের সম্পর্কগুলো যত্ন ও পরিশ্রম দাবি করে, আর চ্যাটবটের কৃত্রিম দুনিয়ায় তা কখনোই সম্ভব নয়।
সূত্র: ইউকন টুডে











