আফ্রিকার শৃঙ্গে মহাবিপদের মেঘ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
খরা আছে, আবার বন্যার আশঙ্কাও। যুদ্ধ থামেনি, খাদ্য ও সারের দাম চড়ছে, তার ওপর রয়েছে রোগের ভয়। আফ্রিকার বৃহত্তর হর্ন বা শৃঙ্গ অঞ্চলে আলাদা আলাদা বিপদ এখন একে অন্যকে এমনভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে যে গবেষকরা তাকে বলছেন ‘পলিক্রাইসিস’— এক সংকট আরেকটিকে বহুগুণে ভয়াবহ করে তোলা বহুমাত্রিক দুর্যোগ।
গত ১৬ জুলাই ‘দ্য কনভারসেশনে’ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দুর্ভিক্ষ, সংঘাত ও মানবিক সংকটের পাঁচ বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল ম্যাক্সওয়েল, অ্যালেক্স ডি ওয়াল, লুকা কুয়োল, মেরি ফিটজপ্যাট্রিক ও পিটার হেইলি সতর্ক করেছেন, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে। তাদের কথায়, ‘পরিণতি বিপর্যয়কর হতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’
প্রথম আঘাত আবহাওয়ার। ২০২৫ সালের শেষ ভাগে সোমালিয়া, পূর্ব কেনিয়া ও পূর্ব ইথিওপিয়ায় স্বল্পমেয়াদি বৃষ্টি ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত দীর্ঘ বর্ষাও বহু এলাকায় ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ফসল, পশুচারণ ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইথিওপিয়ার জনবহুল উচ্চভূমি, দক্ষিণ সুদান ও সুদানের বড় অংশেও কম বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো কোথাও খরা, কোথাও ভয়াবহ বন্যা ডেকে এনে মানুষকে ঘরছাড়া করতে পারে।
দ্বিতীয় ভয় রোগ। কঙ্গো ও উগান্ডায় ইবোলার একটি অনিশ্চিত ধরন ছড়িয়েছে। সেটি দক্ষিণ সুদানে পৌঁছালে মহামারীর ঝুঁকির পাশাপাশি অন্য দুর্যোগ মোকাবিলাও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা গবেষকদের।
তার ওপর যুদ্ধ। কেনিয়া ছাড়া বৃহত্তর হর্নের দেশগুলো দীর্ঘস্থায়ী সহিংস সংঘাতে জর্জরিত। সুদান, দক্ষিণ সুদান, ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার যুদ্ধবিদ্রোহ মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন করে তুলছে। এর সঙ্গে ইরান যুদ্ধ পরিবহন ও খাদ্যের দাম বাড়িয়েছে। সারের সরবরাহ সংকট বছরের শেষের ফসলের উৎপাদন কমিয়ে খাদ্যমূল্য দীর্ঘ সময় উঁচুতে রাখতে পারে। হর্ন অঞ্চল এতে দ্বিগুণ আঘাত পাবে— স্থানীয় উৎপাদন কমবে, বিশ্ববাজারের খাদ্যও হবে ব্যয়বহুল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৭ জুলাইয়ের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহত্তর হর্ন অঞ্চলে ৩ কোটি ৭৮ লাখের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় আছে বা পড়তে পারে। তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে ৪৯ লাখের বেশি শিশু, যাদের মধ্যে ১৫ লাখের বেশি শিশুর গুরুতর অপুষ্টির চিকিৎসা প্রয়োজন।
বিপদ আরও গভীর করেছে বৈদেশিক সহায়তা কাটছাঁট। ‘দ্য কনভারসেশনের’ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউএসএইড বন্ধ হওয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তা কমে যাওয়ায় মানবিক সাড়া দেওয়ার অবকাঠামো দুর্বল হয়েছে। কর্মসূচি বন্ধ হয়েছে, কর্মী ছাঁটাই হয়েছে; রোগ নজরদারি ও স্বাস্থ্যসেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু অর্থ বাড়ালেই হারানো সক্ষমতা দ্রুত ফিরবে না।
তাই ভরসা বাড়ছে স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ, প্রতিবেশী ও প্রবাসীদের অর্থে চলা পারস্পরিক সহায়তা নেটওয়ার্কের ওপর। গবেষকরা স্থানীয় উদ্যোগে সরাসরি অর্থায়ন বাড়ানো এবং প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর বাধা শিথিল করার কথা বলেছেন।
তবু তাদের চোখে সবচেয়ে ভয়ংকর চালক যুদ্ধ। সুদান ও ইথিওপিয়ার তিগ্রেতে অনাহারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। সহায়তা কমে যাওয়ায় তথ্য ও নজরদারি ব্যবস্থাও দুর্বল হচ্ছে। ফলে সংকটের প্রকৃত মাত্রা বোঝা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এত বিপদের একসঙ্গে ঘনিয়ে আসাকে গবেষকরা তুলনা করেছেন ‘প্রবাদপ্রতিম পারফেক্ট স্টর্ম’-এর সঙ্গে। দ্রুত প্রতিরোধ না এলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পানির সংকটের সঙ্গে বাড়তে পারে মৃত্যু ও গণবাস্তুচ্যুতি। আফ্রিকার শৃঙ্গের আকাশে তাই মেঘ শুধু বৃষ্টির নয়— যুদ্ধ, ক্ষুধা, রোগ আর ভেঙে পড়া সহায়তারও।





