রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা, হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা ভাবছেন ট্রাম্প

সংগৃহীত ছবি
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানবন্দরে সর্বশেষ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। এদিকে, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও একটি প্রজেক্টাইল পড়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা ও আকাশ প্রতিরক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমন্বয় থাকা সত্ত্বেও কেন দেশটি বারবার হামলার মুখে পড়ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে বারবার হামলা
আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক দিনের ব্যবধানে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় হতাহত হওয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দরের কার্যক্রম ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে রিয়াদের দিকে নিক্ষেপ করা কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। তবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ থেকেও বেসামরিক স্থাপনার ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অন্যদিকে, দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে প্রজেক্টাইল পড়ার ঘটনাটি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে প্রজেক্টাইলটির ধরন, উৎক্ষেপণের উৎস এবং সেটিকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত ট্রাম্পের
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা সামনে এসেছে। এর আগে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক সপ্তাহ ধরে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান ও নৌ অভিযান চালিয়েছিল। ওই অভিযানে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন-সংশ্লিষ্ট সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
নতুন করে মার্কিন হামলা শুরু হলে হুতিদের সামরিক অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও ড্রোন পরিচালনার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সামরিক স্থাপনায় হামলা চালালেই তাদের দীর্ঘমেয়াদি আক্রমণক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। স্থানীয় পর্যায়ে অস্ত্র সংযোজন, বিকল্প স্থাপনা ব্যবহার এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হুতিরা আবার হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। ফলে সম্ভাব্য অভিযানের কার্যকারিতা নির্ভর করবে তাদের সামরিক সক্ষমতার মূল উৎস কতটা দুর্বল করা যায়, তার ওপরও।
আধুনিক প্রতিরক্ষা থাকার পরও কেন হামলা ঠেকানো কঠিন?
সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্যাট্রিয়টের মতো আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ। তারপরও প্রতিটি হামলা প্রতিহত করা কঠিন। কারণ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও আক্রমণকারী ড্রোনের গতি, উড্ডয়নপথ ও শনাক্ত করার বৈশিষ্ট্য এক নয়। প্রতিটি অস্ত্র শনাক্ত করে প্রতিহত করতে উপযুক্ত প্রযুক্তি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
ছোট ড্রোনের রাডারে ধরা পড়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হতে পারে। নিচু দিয়ে উড়লে সেগুলো শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সময় পাওয়া যায় খুব কম। একই সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে একাধিক হামলা হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়ে। প্রতিটি হামলা ঠেকাতে ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হলে অস্ত্রের মজুত ও সরবরাহ বজায় রাখাও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে সাম্প্রতিক হামলাগুলো ঠিক কী কারণে প্রতিরক্ষা বলয় অতিক্রম করেছে, তা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন, রাডারের তথ্য এবং প্রতিরোধ অভিযানের বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।
হুতিদের হাতে কী ধরনের অস্ত্র রয়েছে?
দীর্ঘদিনের সংঘাতের মধ্যে হুতিরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দূরপাল্লার ড্রোন ও অন্যান্য আক্রমণকারী অস্ত্র ব্যবহারে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে রাখা তাদের সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করলে প্রতিরক্ষাকারীকে একাধিক ধরনের হুমকি মোকাবিলার প্রস্তুতি রাখতে হয়।
হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিদেশি প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ এবং স্থানীয় পর্যায়ে অস্ত্র সংযোজনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাদের হাতে আধুনিক অস্ত্র থাকা মানেই সামরিক প্রযুক্তিতে তারা সৌদি আরব বা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে, এমন নয়। বরং তুলনামূলক কম খরচে বারবার হামলা চালানোর সক্ষমতা এবং বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের কৌশল তাদের বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
হুতিদের পেছনে ইরানের ভূমিকা কতটা?
হুতিদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনায় ইরানের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে ইরানের কাছ থেকে হুতিদের অস্ত্র, প্রযুক্তিগত সহায়তা, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন পাওয়ার কথা উঠে এসেছে। এসব সহায়তা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ইরানের সহায়তা এবং নির্দিষ্ট হামলায় ইরানের সরাসরি নির্দেশ, দুটি আলাদা বিষয়। হুতিদের নিজস্ব নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। তাই রিয়াদ বা দাম্মামের সাম্প্রতিক হামলার নির্দেশ সরাসরি তেহরান থেকে এসেছে, এমন দাবি করার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।
সৌদি আরবের পাশে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও তুরস্ক
সৌদি আরবের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে একাধিক দেশের অস্ত্র ও প্রযুক্তি থাকলেই সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি অভিন্ন নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে যায় না। কার্যকর যৌথ প্রতিরক্ষার জন্য সমন্বিত রাডার ও গোয়েন্দা তথ্য, দ্রুত যোগাযোগ, যৌথ কমান্ড কাঠামো এবং পর্যাপ্ত অস্ত্রের মজুত প্রয়োজন।
কোন দেশ কোন স্থাপনার নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা সমন্বিত এবং সাম্প্রতিক হামলার সময় কোন ইউনিট সক্রিয় ছিল, এসব তথ্য ছাড়া মিত্রদেশগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। তাই সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা চ্যালেঞ্জকে শুধু অস্ত্রের ঘাটতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রযুক্তি, প্রস্তুতি, তথ্য বিনিময় এবং বিভিন্ন ধরনের হামলার বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করার তাৎপর্য
রিয়াদ ও দাম্মামের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর আক্রান্ত হলে তার প্রভাব সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়া, যাত্রীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ এর সম্ভাব্য পরিণতি। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোর জরুরি নিরাপত্তা এবং বিকল্প ব্যবস্থা চালু রাখার প্রস্তুতিও প্রয়োজন।
সামনে কী হতে পারে?
ট্রাম্প প্রশাসন হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আবার পাল্টা হামলার আশঙ্কাও বাড়তে পারে।
সৌদি আরবের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান শুধু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে না। ড্রোন শনাক্তকরণ, আগাম সতর্কতা, যৌথ প্রতিরক্ষা, অস্ত্র সরবরাহের নেটওয়ার্ক মোকাবিলা এবং ইয়েমেনের সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানও গুরুত্বপূর্ণ।
রিয়াদ বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলা এবং দাম্মামের কাছে প্রজেক্টাইল পড়ার ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে। ট্রাম্পের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে নতুন দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে বিমান হামলা হুতিদের আক্রমণক্ষমতা কতটা কমাতে পারবে, তা নির্ভর করবে তাদের অস্ত্রের উৎস, পুনরায় হামলা চালানোর সক্ষমতা এবং সংঘাতের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।



