পাতায়া: জেলেপাড়া যেভাবে হয়ে উঠল যৌন পর্যটনের শহর

থাইল্যান্ডের পাতায়া শহরের সড়কের পাশে একটি বারে অপেক্ষা করছেন কয়েকজন তরুণী। ছবি: রয়টার্স
সাগরের নীল জলে জেলেদের নৌকা, তীরে ছোট ছোট ঘর আর শান্ত এক জনপদ। একসময় এমনই ছিল থাইল্যান্ডের পাতায়া। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই দৃশ্য। মার্কিন সেনাদের আগমন ও পর্যটনশিল্পের বিস্তারে পাতায়া এখন বিশ্বের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র। দীর্ঘ সৈকত, রাতের জীবন ও যৌন ব্যবসার কারণে শহরটি পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘সিন সিটি’ নামে।
সেই পুরনো পরিচয়ের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে নতুন এক বাস্তবতা। ২০০ দিনের বেশি সময় সমুদ্রে কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন থাইল্যান্ডের লায়েম চাবাং বন্দরে পৌঁছেছে। স্থানীয় সময় বুধবার রণতরীটি বন্দরে ভেড়ে। এতে থাকা প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন সেনাদের পাঁচ দিনের বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাদের অনেকেই কাছের পর্যটন শহর পাতায়ায় যাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন সেনাদের এই সফর পাতায়ার ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তির খবর। তাদের হিসাবে, মার্কিন সেনাদের ব্যয় শহরের অর্থনীতিতে কয়েক মিলিয়ন ডলারের জোগান দিতে পারে। তবে বিপুল দর্শনার্থীর কারণে কঠিন হতে পারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। তাই শহরের সৈকত ও রাতের বিনোদনকেন্দ্রে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
জেলেপল্লি থেকে পর্যটন নগরী
প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের শহর পাতায়া দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত ও রাতের বিনোদনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। পাতায়ার এই দ্বৈত পরিচয় নতুন নয়। শহরটির পর্যটনশিল্পের শিকড় গড়ে উঠেছিল মার্কিন সেনাদের হাত ধরেই।
১৯৫০ সালের শেষ দিকে পাতায়া ছিল থাইল্যান্ডের উপসাগরের পূর্ব উপকূলে একটি ছোট জেলেপল্লি। ব্যাংকক থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বের এই জনপদের অর্থনীতি ছিল মূলত মাছ ধরা ও স্থানীয় বাণিজ্যনির্ভর।
১৯৫৯ সালের জুনে একদল মার্কিন সেনা বিশ্রামের জন্য পাতায়ায় আসেন। তারা সৈকতের দক্ষিণ প্রান্তে কয়েকটি বাড়ি ভাড়া নেন। ফিরে গিয়ে তারা সহকর্মীদের কাছে পাতায়ার সৈকত ও পরিবেশের প্রশংসা করেন। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে শহরটির নাম। এরপর আরও মার্কিন সেনা ছুটিতে সেখানে আসতে শুরু করেন।
তাদের চাহিদা মেটাতে স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়িকে অতিথিশালা বানাতে শুরু করেন। গড়ে ওঠে রেস্তোরাঁ, বার ও হোটেল। পর্যটন ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়ে। একসময়কার শান্ত জেলেপল্লি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বিদেশি পর্যটকদের গন্তব্য।
১৯৭৮ সালে পাতায়া শহরের মর্যাদা পায়। ১৯৮০ সালে উঁচু ভবনের কনডোমিনিয়াম, হোটেল ও পর্যটন অবকাঠামোর দ্রুত বিস্তার ঘটে। মার্কিন সেনাদের আনাগোনা কমে গেলেও পশ্চিমা পর্যটকদের কাছে শহরটির আকর্ষণ কমেনি।
পাতায়ার রাতের জীবনও এ সময় বদলে যায়। সৈকতসংলগ্ন এলাকায় একসময় মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত মানুষের চলাচল ছিল, এখন সেখানেই বার, রেস্তোরাঁ ও বিনোদনকেন্দ্রে ভরা।
থাইল্যান্ডে পতিতাবৃত্তি আইনত নিষিদ্ধ। তারপরও পাতায়ার কিছু এলাকায় যৌন ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই কারণেই শহরটির ‘সিন সিটি’ পরিচিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এখন সেই ভাবমূর্তি বদলাতে চাইছে। পরিবারবান্ধব পর্যটন, নতুন আকর্ষণ ও শিশুদের উপযোগী আবাসন তৈরিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
তবে নিয়ন আলোয় ঝলমলে পাতায়ার ওয়াকিং স্ট্রিট এখনো রেস্তোরাঁ, পার্টি, নাইটক্লাব ও যৌন প্রদর্শনীর ব্যস্ত কেন্দ্র।
পাতায়ার অর্থনীতির জন্য পর্যটন এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর একটি। শহরটিতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসেন। তবে সম্প্রতি বৈশ্বিক ভ্রমণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে পর্যটন ব্যবসা চাপে পড়েছে। ফলে প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনার কয়েক দিনের অবস্থান স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাতায়ার মেয়র পোরামেত এনগামপিচেস জানিয়েছেন, তীরে অবস্থানের সময় ও রাতযাপনের ওপর নির্ভর করে একজন মার্কিন সেনা দিনে প্রায় ১ হাজার থেকে ৩ হাজার থাই বাত বা ৩০ থেকে ৯১ ডলার পর্যন্ত খরচ করতে পারেন বলে আশা করছে স্থানীয় সরকার। এতে রেস্তোরাঁ, হোটেল, পরিবহন ও অন্যান্য পর্যটন ব্যবসা লাভবান হওয়ার আশা করছে স্থানীয় প্রশাসন।
তবে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও সতর্ক কর্তৃপক্ষ। মার্কিন সেনাদের জন্য কিছু ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্যারাসেইলিংয়ের মতো বিনোদনমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি মাদক সেবনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশি টহলও বাড়ানো হয়েছে।
প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ পর্যটক পাতায়ায় আসেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহরটির পর্যটন ব্যবসা ধাক্কা খেয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ।
পাতায়ার ব্যবসায়ীরা অবশ্য এই সফরকে স্বাগত জানাচ্ছেন। পাতায়া নাইটলাইফ বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিসা হ্যামিলটন জানান, দীর্ঘদিনের মন্দা ব্যবসায় এই কয়েক দিনের ভিড় কিছুটা গতি আনবে।
তবে পাতায়ার জন্য প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতির নয়। একদিকে শহরটি পরিবারবান্ধব আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি পাল্টাতে চাইছে। অন্যদিকে সৈকত, নিয়ন আলো আর রাতের বিনোদন ঘিরে গড়ে ওঠা পুরনো পরিচয় এখনো টিকে আছে।
ব্যাংকক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পিফাটপং ফাকফারে সতর্ক করে বলেছেন, বিপুলসংখ্যক পর্যটক ও ক্রেতার আগমনে যৌন শোষণ এবং যৌনবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট










