মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের পরীক্ষা

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আজ বড় পরীক্ষার দিন। দেশ জুড়ে (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। একই সঙ্গে ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন এবং হাজার হাজার অঙ্গরাজ্য আইনসভার আসনেও ভোট দেবেন মার্কিন নাগরিকরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এই নির্বাচন তার জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক অবস্থানের বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
এই নির্বাচনে কংগ্রেসের (পার্লামেন্ট) নিয়ন্ত্রণ হারালে আগামী দুই বছর কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে ট্রাম্প প্রশাসনকে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার বিষয় নয়; এটি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগাম রাজনৈতিক সমীকরণও সৃষ্টি করবে।
কোন কোন পদে ভোট হবে
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে নির্বাচন হবে। দ্বিতীয়ত, ১০০ সদস্যের সিনেটে ৩৫টি আসনে ভোট হবে। এর মধ্যে নিয়মিত নির্বাচনের ৩৩টি আসনের পাশাপাশি দুটি বিশেষ নির্বাচন রয়েছে।
তৃতীয়ত, ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৩৬টিতে গভর্নর নির্বাচিত হবেন। পাশাপাশি ওয়াশিংটন ডিসি ও তিনটি মার্কিন অঞ্চলেও গভর্নর বা সমপর্যায়ের নির্বাহী নেতৃত্বের নির্বাচন রয়েছে। তবে সেগুলো ৩৬টি অঙ্গরাজ্যের হিসাবের বাইরে। ৪৬টি অঙ্গরাজ্যের ৮৮টি আইনসভা কক্ষেও ছয় হাজারের বেশি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অ্যাটর্নি জেনারেলসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ এবং স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনও রয়েছে।
অর্থাৎ একজন ভোটার তার বসবাসের অঙ্গরাজ্য ও নির্বাচনী এলাকার ওপর নির্ভর করে একই ব্যালটে একাধিক পদে ভোট দিতে পারবেন।
কত ভোটার ভোট দেবেন
যুক্তরাষ্ট্রে ভোট দেওয়ার যোগ্য নাগরিকের সংখ্যা আনুমানিক ২৪ কোটি ৫০ লাখের কাছাকাছি। তবে সবাই ভোট দেবেন না। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ১০ কোটির বেশি ভোটার অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভোটার উপস্থিতির ওপরই অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ভাগ্য নির্ভর করবে।
নির্বাচনের আগেই ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া দেখা গেছে। ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার ইলেকশন ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, ১ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত আগাম ভোট পড়েছে ৫ কোটি ৩৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৯৮ লাখ ভোটার সরাসরি কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ৩৯ লাখের বেশি ভোটার।
জনমত জরিপে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা
নির্বাচনের আগের জনমত জরিপগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পিবিএস, এনপিআর ও মারিস্টের এক জরিপে কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন জানিয়েছেন ৫২ শতাংশ ভোটার। রিপাবলিকানদের পক্ষে রয়েছেন ৪৪ শতাংশ।
মূলত জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানির দাম এবং ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ভোটারদের আলোচনায় উঠে এসেছে। এসব ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের জন্য বাড়তি সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
কোন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে মেইন, ওহাইও, নর্থ ক্যারোলিনা, আইওয়া ও জর্জিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। টেক্সাস, মিশিগান ও কানসাসের মতো রাজ্যেও নির্বাচনী লড়াইয়ের দিকে নজর রয়েছে।
গভর্নর নির্বাচনেও রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। জর্জিয়া, কানসাস, নেভাদা ও উইসকনসিনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ কাছাকাছি। অন্যদিকে মিশিগান, ওহাইও, আইওয়া ও আলাস্কার মতো রাজ্যেও দলীয় নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
পেনসিলভানিয়া, উইসকনসিন ও মিশিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে গভর্নর এবং কংগ্রেসের আসনগুলোও জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলাফল কখন জানা যাবে
স্থানীয় সময় সকাল থেকে শুরু হবে ভোটগ্রহণ। তবে সব অঙ্গরাজ্যে ভোটকেন্দ্র খোলা ও বন্ধের সময় এক নয়। পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি কেন্দ্রে সন্ধ্যা ৬টা থেকেই ভোট গণনার প্রাথমিক তথ্য আসতে শুরু করবে। আলাস্কায় সর্বশেষ ভোটকেন্দ্র বন্ধ হবে রাত ১টার দিকে। নির্বাচনের রাতেই অনেক আসনের ফলাফল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলোতে ডাকযোগে আসা ব্যালট, পুনর্গণনা এবং আইনি প্রক্রিয়ার কারণে ফল ঘোষণা কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পিছিয়ে যেতে পারে। মেইনের র্যাঙ্কড-চয়েস ভোট এবং জর্জিয়ায় সম্ভাব্য রানঅফও চূড়ান্ত ফল প্রকাশে সময় নিতে পারে।
আগামী দুই বছরের রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়বে
এবারের নির্বাচনের প্রভাব থাকবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি, ব্যয় ও সরকারি কার্যক্রম নিয়ে তদন্তের সুযোগ পাবেন। বাজেট, অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও করনীতিতে প্রশাসনের জন্য বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প তার রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে আরও সুবিধা পাবেন। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ থাকলে বিচারক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নিয়োগেও দলটির প্রভাব বজায় থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসন হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। এবারও সেই ঐতিহাসিক প্রবণতা ট্রাম্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে ৩ নভেম্বরের নির্বাচন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য জনপ্রিয়তার পরীক্ষা, ডেমোক্র্যাটদের জন্য ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ। ভোটাররা শুধু নিজেদের এলাকার প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন না, তাদের রায়ের মধ্য দিয়েই ঠিক হবে আগামী দুই বছর ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাবে।



