যুদ্ধের মধ্যেই জাতিসংঘে ইরানি শীর্ষ নেতারা, ভিসা দিল ট্রাম্প প্রশাসন!
- পেজেশকিয়ান-আরাগচি নিউইয়র্কে, একদিন আগেই মাহমুদ আব্বাসের ভিসা বাতিল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তীব্র বিরোধ, হরমুজ প্রণালি ঘিরে অচলাবস্থা, সবকিছুর মধ্যেই নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে শুরু হতে যাওয়া জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলকে ভিসা দিয়েছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ইরানের মূল প্রতিনিধিদল এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক কর্মীদের ভিসা অনুমোদন করা হয়েছে। তবে নিউইয়র্কে তাদের চলাচল ও কেনাকাটার ওপর বিধিনিষেধ থাকবে। গত বছরের তুলনায় এবারের ইরানি প্রতিনিধিদলও ছোট হবে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, ইরানের শীর্ষ নেতাদের ভিসা দেওয়ার সিদ্ধান্তের মাত্র একদিন আগে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও তার প্রতিনিধিদলের ভিসা প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সমাবেশের আগে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যেই মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের পরিস্থিতি এখনো শেষ হয়নি। হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিক করা কিংবা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনায় ফেরার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো চুক্তি হয়নি। একই সময়ে ইয়েমেনের হুথিদের হামলা এবং লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌপথে উত্তেজনা জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে পেজেশকিয়ানের নিউইয়র্ক সফর বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তিনি বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা বিভিন্ন দেশের নেতারাও নিউইয়র্কে থাকবেন।
তবে যুদ্ধ নিয়ে বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা পরিস্থিতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
কেন ইরানকে ভিসা, আব্বাসকে নয় কেন?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
জাতিসংঘের সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ায় আয়োজক দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই নিয়মের আওতায় ইরানের মূল প্রতিনিধিদলকে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে তাদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ এবং নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
অন্যদিকে মাহমুদ আব্বাসের ভিসা প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আন্তর্জাতিক আদালতগুলোতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ এবং অন্যান্য নীতির কথা উল্লেখ করেছে ওয়াশিংটন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা শান্তি ও রাজনৈতিক সমাধানের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আব্বাসকে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে সরাসরি উপস্থিত হতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে ফিলিস্তিনের জাতিসংঘে স্বীকৃত কূটনীতিকরা উপস্থিত থাকবেন এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেলে আব্বাস ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দিতে পারেন।
নিউইয়র্কে এখন কূটনীতির উত্তপ্ত মঞ্চ
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন শুরুর আগেই ওয়াশিংটনের এই দুই সিদ্ধান্ত নিউইয়র্কের কূটনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করেছে। একদিকে যুদ্ধরত ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে এসে জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, অন্যদিকে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট সরাসরি নিউইয়র্কে আসার অনুমতি পাচ্ছেন না।
ফলে আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের মঞ্চে পেজেশকিয়ানের বক্তব্য শুধু ইরানের পররাষ্ট্রনীতি বা যুদ্ধের অবস্থানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ প্রণালি, পরমাণু কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁর বক্তব্যের দিকে তাকিয়ে থাকবে আন্তর্জাতিক মহল।
আর নিউইয়র্কে একই সময়ে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও অন্যান্য বিশ্বনেতাদের উপস্থিতি এই অধিবেশনকে আরও আলোচিত করে তুলছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে সমাধান না এলেও জাতিসংঘের মঞ্চে মুখোমুখি কূটনীতির নতুন কোনো সুযোগ তৈরি হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), রয়টার্স, জাতিসংঘ, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়




