মানুষের কল্যাণই রেজাউলের ব্রত

দেলদুয়ারে ক্যানসার আক্রান্ত তরুণকে সহযোগিতার জন্য তার বাড়িতে রেজাউল করিম
১৯৯৯ সাল। তখনো ছাত্র রেজাউল করিম। পাথরাইলের মঙ্গলহোড় গ্রামে ফুটবল খেলা দেখতে এসে একটি ভবন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন একই গ্রামের নুর হোসেনের ছেলে দুদু মিয়া। দুর্ঘটনার পর একে একে সবাই চলে গেলেও রেজাউল তাকে ফেলে যেতে পারেননি। একটি ভ্যানে করে আহত দুদু মিয়াকে টাঙ্গাইল শহরে নিয়ে যান। নিজের অর্থে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
সুস্থ হয়ে দুদু মিয়া যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেন, তখন হয়তো রেজাউলও বুঝতে পারেননি— একটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই ঘটনা একদিন তার দীর্ঘ সামাজিক সেবা কার্যক্রমের সূচনা হয়ে উঠবে। এরপর থেকে অসুস্থ, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেন তার জীবনেরই অংশ হয়ে যায়।
২০০২ সালে দেলদুয়ারের পাথরাইল ইউনিয়নে মঙ্গলহোড় গ্রামের মসজিদের ইমাম ছিলেন হাফেজ নজরুল ইসলাম। তিনি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মাহমুদনগর ইউনিয়নের কুকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লে রেজাউল নিজের টাকায় তার চিকিৎসা করান; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়নি।
অবিবাহিত নজরুল ইসলামের দীর্ঘ অসুস্থতার সময়ও পাশে ছিলেন রেজাউল। প্রায় দুই যুগ ধরে বিছানায় থাকা এই মানুষটি নিজে উঠে দাঁড়াতে কিংবা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না। তার চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য নিজের অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেদন জানিয়ে অর্থ সংগ্রহ করেন রেজাউল। প্রায় দুই যুগ অসুস্থ থাকার পর মারা যান হাফেজ নজরুল ইসলাম।
শুধু দুদু মিয়া কিংবা হাফেজ নজরুল ইসলাম নন— স্থানীয় অসুস্থ ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এখন রেজাউলের নিয়মিত কাজের অংশ।
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল ইউনিয়নের মঙ্গলহোড় গ্রামের মরহুম আব্দুল বারী মিয়া ও নুরজাহান বেগমের সন্তান রেজাউল করিম। অসুস্থদের হাসপাতালে ভর্তি করাতে বিনামূল্যে যানবাহনের ব্যবস্থা করা, অসচ্ছল শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া, অসহায় মানুষের মৃত্যুর পর দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করাসহ নানা প্রয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তিনি।
রোগীদের রক্তের প্রয়োজন হলেও অনেকের ভরসার জায়গা রেজাউল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রক্তের জন্য আবেদন জানিয়ে রক্তদাতা সংগ্রহের চেষ্টা করেন।
স্থানীয় আলম মাস্টার বললেন, ‘অসহায় কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার দাফন-কাফনের সব খরচের ব্যবস্থা করেন রেজাউল। তাকে এ ধরনের কাজে দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখে আসছি। তাই আমরা মনে করি, সমাজের জন্য এরকম ব্যক্তি পাওয়া আমাদের সৌভাগ্য।’
মঙ্গলহোড়ের ক্যানসার আক্রান্ত সোলে মিয়া, দেওজান গ্রামের সিয়াম, পাথরাইলের সুশান্ত রাজবংশী, দেওজান গ্রামের মিতু আক্তার ও তিথি আক্তার রনির ভাষ্য, ‘রেজাউল করিম আমাদের রক্ত দিয়েছেন। রক্তের প্রয়োজন হলে তিনি সংগ্রহ করে দেন।’
রেজাউল করিম বললেন, ‘মানুষ মানুষের জন্য। যতদিন বেঁচে আছি, এভাবেই জনকল্যাণে কাজ করে যেতে চাই।’
রেজাউল করিম বললেন, ‘পাথরাইলে আমার একটি কোচিং সেন্টার রয়েছে; যেখানে শিশু থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। অসহায় গরিব ছেলেমেয়েরা অর্থের অভাবে যাতে ঝরে না পড়ে— তাদের এখানে বিনামূল্যে পড়ানো হয়। এই প্রতিষ্ঠানের আয়ের বড় একটি অংশ অসহায়দের জন্য ব্যয় করা হয়।



