অরক্ষিত রেলক্রসিং পাহারায় ইসলাম

ট্রেন রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় ব্যারিয়ার ফেলে সতর্ক পাহারায় ইসলাম
দূর থেকে ভেসে আসছে ট্রেনের হুইসেলের শব্দ। ঠিক সেই মুহূর্তে ছুটে এলেন এক ব্যক্তি। রাস্তার দুই প্রান্তে থাকা বাঁশ নামিয়ে আটকে দিলেন যান চলাচল। হাত নেড়ে পথচারীদের সতর্ক করে বললেন, ‘ট্রেন আসছে, আপনারা একটু অপেক্ষা করুন!’ ট্রেন চলে যাওয়ার পর নিজ হাতেই আবার বাঁশ সরিয়ে পথ উন্মুক্ত করে দেন তিনি। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ পৌর শহরের জগথা এলাকার ব্যস্ত রেলক্রসিংয়ে প্রতিদিনের অতিপরিচিত দৃশ্য এটি। এই ক্রসিং নিরাপদ রাখতে টানা পাঁচ বছর ধরে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব পালন করছেন ভ্যানচালক মো. ইসলাম (৫৯)।
জগথা এলাকার সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেলসহ ভারী যানবাহন এবং অসংখ্য পথচারী যাতায়াত করেন। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, এই পথ দিয়ে প্রতিদিন পাঁচটি আন্তঃনগর ও একটি কমিউটার ট্রেন চলাচল করে। কিন্তু সেখানে রেলওয়ের নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো স্থায়ী গেটম্যান বা যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের কোনো আধুনিক প্রতিবন্ধক ব্যবস্থা নেই।
২০২১ সালের জগথা রেলক্রসিংয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারান জেলা জজশিপের দুই কর্মচারী। ওই দুর্ঘটনা দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা ইসলাম। দুর্ঘটনার পর নিজ উদ্যোগেই তিনি সেখানে একটি অস্থায়ী বাঁশের ব্যারিয়ার তৈরি করেন। এরপর থেকে পাঁচ বছর ধরে সেখানে নিয়মিত অবৈতনিক গেটকিপারের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। শীতের সকালের কনকনে হাওয়া বা গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ, ঝড়বৃষ্টি উপক্ষো করে ট্রেনের সময় হলেই পাহারায় দাঁড়িয়ে যান এই স্বেচ্ছাসেবী।
ইসলাম পেশায় একজন ভ্যানচালক। প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তার সংসার। রেলক্রসিংয়ের কাছেই রেলওয়ের জমিতে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। ট্রেনের সময় হলে তিনি রেলক্রসিংয়ে এসে পাহারা দেন। কখনো ভ্যান নিয়ে দূরে কোথাও গেলে পরিবারের সদস্যদের বলে যান রেলক্রসিং পাহারা দিতে। তখন তার পরিবারের সদস্যরা অথবা আশপাশের কেউ সেই দায়িত্ব পালন করেন।
ইসলামের দাবি, তার এই সতর্ক পাহারার কারণে গত পাঁচ বছরে এই রেলক্রসিংয়ে আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী, হৃদয় ও প্রফুল্ল কুমারের ভাষ্য, প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন ও মানুষ ঝুঁকি নিয়ে এই ক্রসিং দিয়ে পারাপার হয়। দ্রুত সেখানে একজন স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
পীরগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নসরতে খোদা রানা বললেন, ‘ভ্যানচালক ইসলাম নিজের চরম অভাবের মধ্যেও শুধু মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদে স্বেচ্ছায় যে কাজ পাঁচ বছর ধরে করে আসছেন, তা সত্যিই নজিরবিহীন।’
পীরগঞ্জ রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার সোহরাব হোসেন বললেন, জগথা এলাকায় এক ব্যক্তি বাঁশের ব্যারিয়ার দিয়ে স্বেচ্ছায় রেলক্রসিংটি পাহারা দিচ্ছেন, তা তাদের জানা আছে। বিষয়টি এরই মধ্যে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদার জানিয়েছেন, এই অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত অভাবী এই ভ্যানচালককে স্থানীয়ভাবে কোনো আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা করা যায় কি না, সে বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করবেন।



