সচেতন করতে জহিরের দেয়াল লিখন

ঝিনাইদহের একটি দেয়ালে সচেতনতামূলক কথা লিখছেন জহির রায়হান- আগামীর সময়
কৃষক পরিবারের সন্তান জহির রায়হান (৪৫) পেশায় রঙমিস্ত্রি। অভাবের সংসারে পারেননি লেখাপড়া করতে। ১২ বছর ধরে তিনি রাস্তার পাশে গাছ লাগান, দেয়ালে রঙ করে মনীষীদের বিভিন্ন বাণী ও পরামর্শমূলক বক্তব্য লেখেন, পশুপাখির জন্য গড়ে দেন নিরাপদ আশ্রয়। ক্ষেতে কর্মরত কৃষকদের তৃষ্ণা নিবারণে বসিয়েছেন নলকূপ।
স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে জহিরের সংসার। রঙমিস্ত্রির কাজ করে যে মজুরি পান, তার এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় করেন এসব কাজে। এতে উৎসাহ দিতে তাকে কয়েকজন ব্যক্তিও করেন সহযোগিতা।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার রামনগর গ্রামের কৃষক কেয়ামুদ্দিন মোল্লার ছেলে জহির রায়হান জানালেন, তিনি প্রথমে বিভিন্ন বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে দেয়ালে লেখা শুরু করেন মনীষীদের বাণী। বিভিন্ন শহর বা গ্রামগঞ্জে রাস্তার ধারে গাছ লাগানো, মাঠে কৃষকদের জন্য বিশ্রামাগার তৈরি করা; সেখানে সুপেয় পানির জন্য নলকূপ স্থাপন, পাখির আবাসের জন্য
গাছে গাছে বাসা তৈরি, অসহায় ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ দেওয়াসহ জনহিতকর ও সেবামূলক কাজ অব্যাহত রেখেছেন জহির।
বর্তমানে প্রচণ্ড গরমে তিনি লেগে পড়েছেন পাখির তৃষ্ণা মেটানোর কাজে। গাছে গাছে বেঁধে দিচ্ছেন পাতিল। সেসব পাতিলে রেখে দেন পানি। তৃষ্ণার্ত পাখিরা পানি পান করে এসব পাতিল থেকে।
জহির এ পর্যন্ত ঝিনাইদহ সদর উপজেলার অন্তত ৫০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের দেয়ালে এবং বিভিন্ন বাজারের পাশে দেয়ালে লিখে দিয়েছেন মনীষীদের বাণী। জানালেন, সামাজিক কাজ করতে পারলে এমনিতেই ভালো লাগে। পাশাপাশি যখন কেউ বলে এ কাজটা জহিরের কাছ থেকে শিখেছি, জহির যা করে তা অনেকেই পারে না— এসব শুনলে খুব ভালো লাগে। তাই এ কাজ অব্যাহত রাখবেন তিনি।
‘জহির রায়হান কৃষকের বন্ধু। নিজের সংসার টানাপড়েনের মধ্যে চললেও কাজ করেন মানুষের উপকারে। ক্ষেতের পাশে তিনি যেসব বিশ্রামাগার করেছেন, সেখানে কৃষকরা বিশ্রাম নেন; আশ্রয় নেন ঝড়-বৃষ্টিতে। তার মতো মানুষ সমাজে খুব কমই আছে’— বলছিলেন রামনগর গ্রামের কৃষক সেলিম শাহ ও ফারুক হোসেন।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ ও ক্ষেতের কৃষকদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য জহির সদর উপজেলার রামনগর, নগরবাথান মোড়, ভবানীপুর, দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ২০টি নলকূপ স্থাপন করেছেন।
ভবানীপুর গ্রামের মিলন হোসেন ও রামনগর গ্রামের বিশু মিয়া বলেছেন, ‘কৃষকরা সারাদিন মাঠে পরিশ্রম করেন। কাজের সময় পিপাসা লাগে। আগে দূর থেকে পানি এনে খেতে হতো। জহির মাঠেই নলকূপ বসিয়ে দেওয়ায় আমাদের অনেক সুবিধা হয়েছে।’
স্থানীয় কুমড়াবাড়িয়া ইউপির চেয়ারম্যান সিরাজ উদ্দিন বললেন, ‘জহির রায়হান জেলার গর্ব, তার মতো মানবিক মানুষ সমাজে কমই আছে। তিনি কৃষকদের জন্য বিশ্রামের স্থান ও বিশুদ্ধ পানির জন্য নলকূপ স্থাপন করে দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে যেমন সচেতন করছেন, তেমনি পশুপাখির জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে স্থান করে নিয়েছেন মানুষের মনে।






