লাল কার্ডে শুরু গোলে শেষ

চিলির রেফারি ফার্নান্দো ভেজার দিয়াস যেন সেই আবেগঘন রাতের পরিবেশ পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিলেন। পেনাল্টি বক্সে অগাস্টিন গিয়াই ফাউলের শিকার হওয়া মাত্রই তিনি পেনাল্টির বাঁশি বাজাতে এক সেকেন্ডও দেরি করেননি।
এরপর তৈরি হয় এক নিখুঁত দৃশ্যপট। লিওনেল মেসি বল হাতে নিয়ে পেনাল্টি স্পটে দাঁড়ান; যেন সেই অধরা গোলের দেখা পেতে তিনি মুখিয়ে ছিলেন। আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির হয়ে নিজের শেষ তিনটি পেনাল্টি মিস করলেও এবার আর ভুল করেননি এই কিংবদন্তি।
বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই ৩-০ ব্যবধানের জয়টি মেসির বিদায়ী পারফরম্যান্সের এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। ম্যাচ জুড়ে মেসি বল স্পর্শ করেছেন ৯১ বার। একটি গোলের পাশাপাশি দুটি অ্যাসিস্ট। অভিষেকে লাল কার্ড দেখা মেসির বিদায়ে এর চেয়ে ভালো চিত্রনাট্য আর কী হতে পারে।
মেসির শেষ ম্যাচটি শুধু একটি প্রীতি ম্যাচের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না— এটি ছিল মূলত একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। ম্যাচ শুরুর আগে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিভার প্লেটের সম্মানসূচক সদস্যপদ তুলে দেওয়া হয় মেসির হাতে। ক্লাবটির সভাপতি স্তেফানো দি কার্লো মেসির হাতে বিশেষ এই কার্ড ও স্মারক জার্সি তুলে দেন। কার্ডটিতে কোনো সাধারণ নম্বর না রেখে ব্যবহার করা হয়েছে এক ঐতিহাসিক কোড— ‘এআরজি ১৮১২২০২২’, যা মনে করিয়ে দেয় ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর কাতারে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের সেই সোনালি মুহূর্তটিকে।
রিভার প্লেটের সম্মান ছাড়াও এদিন বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেসিকে দেওয়া হয়েছে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি, যা ফুটবল জাদুকরের বিশ্ব জুড়ে তার অসামান্য প্রভাবের স্বীকৃতি। বিদায়ের দিনে পেয়েছেন কিছু উপহারও। এর অন্যতম বিশেষ জার্সি, স্মারক মূর্তি, চ্যাম্পিয়নশিপ রিং, ট্রফির রেপ্লিকা, বইয়ের সংগ্রহ— এমনকি ম্যাচের লাল-হলুদ কার্ডও।
ম্যাচ শুরুর আগের মুহূর্তগুলোও ছিল চরম আবেগঘন। তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও এবং সিরোকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন মেসি। এ সময় মাঠের কর্মীরা ১০ নম্বর জার্সিখচিত এক বিশাল জার্সি মাঠে মেলে ধরেন, যেখানে মেসির নামের নিচে লেখা ছিল ‘গ্রেসিয়াস’, যার অর্থ ‘ধন্যবাদ’। জাতীয় সংগীতের সময় এবং ম্যাচের ১০ মিনিটের মাথায় যখন তার প্রতি সম্মানে খেলা থামিয়ে পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে করতালি দিতে শুরু করে, তখন নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে তাকে বেশ কষ্ট করতে হয়। ফকল্যান্ডস বা মালভিনাস যুদ্ধের বীর ফ্যাবিও সান্তানার কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মেসি। চোখের পানি মোছেন কয়েকবার।
ম্যাচ শেষে মেসির বিদায়ী বক্তব্যে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তার সতীর্থরা। তবে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছিলেন এনসো ফের্নান্দেস। মেসি কথা বলার সময় অঝোরে কাঁদছিলেন আর্জেন্টিনার এই মিডফিল্ডার। ২০১৬ সালে মেসিকে জাতীয় দল থেকে অবসর না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে একটি আবেগঘন চিঠিও লিখেছিলেন ফের্নান্দেস। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে টিওয়াইসি স্পোর্টসকে তিনি বলেছেন, ‘দিনটা খুব আবেগের ছিল। আশা করি, লিও-ও রাতটা উপভোগ করেছে। তাকে খুব মিস করব আমরা।’
কেঁদেছেন কোচ লিওনেল স্কালোনিও। ম্যাচ শেষে বলেছেন, ‘মেসির শূন্যতা পূরণের নয়।’ এই শূন্যতা নিয়েই এখন নতুন পথচলা আর্জেন্টিনার, যেখানে না থেকেও হয়তো প্রবলভাবে থাকবেন মেসি।



