ঢাকা টু কাতার ভায়া ব্রাজিল

২০১১ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে অদম্য মেসি
ফুটবল জাদুকরের সঙ্গেই বেড়ে ওঠা। ঢাকায় মাঠে বসে প্রথম মেসি-দর্শন হয়েছিল ২০১১ সালে। বার্সার জার্সি গায়ে অবিশ্বাস্য কাণ্ড-কীর্তি করছেন তারও আগে থেকে। ঢাকায় এসে সেবার ফুটবলের এক মোহনীয় আবির ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে তার গোল দেখা হয়নি, তবে দেখেছিলাম অনন্য এক শিল্পকর্ম। ২৬ মিনিটে এক মুভেই মেসি ভুলিয়ে দিয়েছিলেন গোলের আক্ষেপ।
মাঝমাঠে তার পায়ে আসে বলটি। তারপর শুরু হলো দৌড়। তার বাঁ পায়ের দিকে ছুটে গেলেন তিন নাইজেরিয়ান ফুটবলার। তারা ঘিরে ধরলেন, গুঁতো দিলেন কিন্তু ওই বাঁ পা ছুঁতে পারল না। যেন রেশমের সুতোর মতো ছোট ফাঁক গলে বেরিয়ে গেল সেই পা। বক্সের মুখে এসে দাঁড়ালেন আরেক ডিফেন্ডার। তাকেও পাশ কাটিয়ে ঢুকে গেলেন আরও ভেতরে। এরপর বাঁ পায়ের শট, কিন্তু গোলরক্ষক ডাইভ দিয়ে ফিরিয়ে দিলেন। ফিরতি বল খালি পোস্টে জমা করলেন ডি মারিয়া। গোল হলো তার কিন্তু জয়োধ্বনি হলো মেসির দৌড়ের, ওই বাঁ পায়ের। এটিই তার জাদুর কাঠি, কবির কলম কিংবা শিল্পীর তুলি।
এমন এক বাঁ পা থাকলে আর ডান পায়ের দরকার কি! এই বাঁ পায়ের জাদুকরের মহিমা বোঝাতে গিয়ে পেপ গার্দিওলা চমৎকার তুলনা করেছিলেন, ‘একজন ইঞ্জিনিয়ারের হাতে যদি পারফেক্ট ফুটবলার তৈরি হয়, সে হতে পারে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। তবে কোনো শিল্পীর হাতে তৈরি হলে সে হবে মেসি।’ এরপর যতদিন গেছে, শিল্পীর বাঁ পায়ের মহিমা ততই বেড়েছে।
২০১৪ বিশ্বকাপেও দেখেছি সেই পায়ের জাদু। তখনো তিনি ছিলেন একা এক শিল্পী, তাকে কেন্দ্রে পুরো ক্যানভাসটা কীভাবে আঁকতে হয়, সেটা প্রথম বুঝেছিলেন কোচ আলেহান্দ্রো সাবেইয়া। এগিয়ে যাচ্ছিল আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপও কিন্তু শেষ দৃশ্যটুকু লেখা হয়নি নিজের মতো করে। একটুখানি এদিক-ওদিক আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সোনালি ট্রফিটা থেকে গেল অধরা। ফাইনালের ফলটা বদলে যেত, হিগুয়াইন ও পালাসিও যদি অমন সহজ সুযোগ নষ্ট না করতেন, আজ মেসির বিশ্বকাপের গল্পটা অন্যরকম হতো। হয়তো তার ঝুলিতে থাকত একাধিক বিশ্বকাপ।
অদ্ভুত ব্যাপার, বিশ্বকাপ নামের এ মঞ্চটাই যেন বিশাল এক চাপ হয়ে চেপে বসেছিল মেসির জীবনে। ক্লাব ফুটবলের মঞ্চে যেখানে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য স্বচ্ছন্দ, বিশ্বকাপে এসে সেই শিল্পীর তুলিও কেঁপে উঠত। স্বাভাবিক খেলাটাও খানিকটা এলোমেলো হয়ে যেত। প্রত্যাশার পাহাড়ে জাদুর কাঠিও যেন উল্টোপাল্টা কাজ করত।
২০২২-এর কাতারেও সেই অস্থিরতার ছায়া দেখেছি। দেখেছি তার চোখেমুখে চাপের গভীর রেখা। বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচে দেখেছি, একজন জাদুকরের চোখেও যে ভয়, উৎকণ্ঠা বাসা বাঁধতে পারে। এটাই ছিল মেসির মানবিক চরিত্র। তার কাঁধে ছিল একটি দেশের কয়েক দশকের অপেক্ষা, কোটি মানুষের স্বপ্ন আর নিজের অসমাপ্ত গল্পের ভার। লুসাইলে সোনালি ট্রফি চুম্বনে সেই গল্প শেষ হতেই এই বিশ্বকাপে চাপহীন মেসি আরও উপভোগ্য।



