প্রবাসী ছাড়া অচল জাতীয় দল!

ছবি: মোশারফ হোসেন
এক ঐতিহাসিক বাঁকবদল হচ্ছে বাংলাদেশ ফুটবলের। আসিয়ান ফুটবল টুর্নামেন্টের ২৩ জনের স্কোয়াডে ৯ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার। তাদের গায়ের রঙ বাদামি, দু-একজন হয়তো বিদেশির মতো, তবে তারা এখন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী। তাদের নিয়েই থমাস ডুলি রওনা হয়েছেন ইন্দোনেশিয়ায় আসিয়ান কাপ খেলতে।
এই প্রথম সর্বোচ্চ ৯ জন প্রবাসী বাংলাদেশি, যারা গুণগত মানে পেছনে ফেলেছেন দেশিদের। এরপরও বাংলাদেশের আমেরিকান কোচ থমাস ডুলি বলেছেন, বাস্তবতা বুঝে প্রত্যাশা কমিয়ে রাখতে। হামজা-শমিত-ফারহানদের দলে নিয়েও মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষেও খানিকটা স্বপ্ন দেখা যাবে না!
বংশোদ্ভূত ফুটবলারের সংযোজন শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালে ডেনমার্ক প্রবাসী জামাল ভূঁইয়াকে দিয়ে। সেই থেকে ১৩ বছরে বাংলাদেশ জাতীয় দলে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যাটা উন্নীত হয়েছে ৯ জনে। তবে মহা বিস্ফোরণ হয়েছে গত বছর মার্চে হামজা চৌধুরী গায়ে লাল-সবুজ জার্সি জড়ানোর পর। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের এই ফুটবলার আসলে বিজ্ঞাপনের মতো কাজ করেছে। শমিত সোমসহ অন্যরাও যেন সাহস পেয়েছেন বাংলাদেশ দলে খেলার।
এরপরই সংখ্যাটা বেড়ে এখন ৯ জনে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সাবেক তারকা ফরোয়ার্ড জাহিদ হাসান এমিলি বাড়-বাড়ন্ত প্রবাসী বাংলাদেশির কারণ ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘আমাদের দেশে এখন মানসম্পন্ন ফুটবলারের বড় অভাব, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের এনে জাতীয় দলে রেজাল্ট পাওয়ার সুযোগ। এজন্য মানুষের মধ্যেও বাংলাদেশ দল নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আশঙ্কার জায়গা হলো, মানুষের এই আগ্রহ বেশি থাকবে না, হামজা চলে গেলে কিন্তু ধস নামবে। তাই হামজার মানের না হলেও মোটাদাগে ভালো ফুটবলার তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে বাফুফেকে। নইলে বড় সংকটে পড়বে দেশের ফুটবল।’
সম্ভাব্য সংকট নিয়ে বাফুফের কোনো হেলদোল নেই। তারা হন্যে হয়ে খুঁজছে শুধু প্রবাসী বাংলাদেশি। বিনিয়োগ ছাড়াই ‘ফিনিশড প্রোডাক্ট’ পেয়ে যাচ্ছে। এভাবে ফসল পেলে নিজের জমিতে কষ্ট করে ধান বোনারই-বা দরকার কী!
জাহিদ হাসান মনে করেন, ‘দেশে ভালো ফুটবলার তৈরি না হওয়ার বড় কারণ ফেডারেশনের ভুল চিন্তাধারা। কোয়ালিটি খেলোয়াড় বের করার দিকে তাদের মোটেও নজর নেই। তৃণমূলে কোনো কাজ নেই। একটা লিগ শুরু হয়েছে মাত্র এক দিনের ট্রেনিংয়ে। ঘরোয়া ফুটবলের অবকাঠামোই যদি এমন হয়, খেলোয়াড় কীভাবে তৈরি হবে।’
আবাহনীর কোচ মারুফুল হক দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার সুবাদে জানেন দেশের ফুটবলারদের অবস্থা কতটা খারাপ। সেটি তিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘একজন চ্যাম্পিয়নিশপ লিগের ফুটবলার যদি ট্রানজিশন না জানে তাহলে আমাদের ফুটবলারদের মান কোন জায়গায় আছে বোঝাই যায়। না জানার কারণ, সে যেভাবে উঠে আসছে, কখনো কেউ তাকে এ শব্দটা বলেনি। অর্থাৎ আমাদের একাডেমিগুলোতেই গলদ, সেখানকার ফুটবল শিক্ষায় গলদ। এটার দায় ফুটবলারদের নয়, তাদের জন্য আমরা ভালো ফুটবল শেখানোর জায়গা করে দিতে পারিনি। যতদিন আমরা একদম নিচের লেভেলে মনোযোগ দেব না, ঘরোয়া ফুটবলকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবব না, ততদিন কোনো আশা দেখি না।’
একসময় দেশের ফুটবলে ছিল উল্লাস, উন্মাদনা আর মাঠ কাঁপানো দেশি তারকাদের মহিমা। সেই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য শেষ হয়ে গেছে পরিচর্যার অভাবে। এই শূন্যতা ঢাকতেই দৃশ্যপটে নিয়ে আসা হচ্ছে বংশোদ্ভূত প্রবাসী ফুটবলারদের। আসন্ন আসিয়ান কাপের দলে ৯ প্রবাসীর অন্তর্ভুক্তি কোনো অগ্রগতির স্মারক নয়; বরং এটি আমাদের ঘরোয়া ফুটবল কাঠামোর চরম ধসের এক স্পষ্ট দলিল।



