কিংবদন্তির ভাগ্যে মর্যাদাপূর্ণ কারাবাসও জোটে না!

সময় বড় নিষ্ঠুর। পাকিস্তানের জাতীয় গর্বের প্রতীক এবং একসময়ের লাখো কোটি তরুণের অনুপ্রেরণাদায়ী ইমরান খান আজ অন্ধকার কারাকক্ষে দৃষ্টিশক্তি হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন!
ইমরান খানই প্রথম পাকিস্তানকে বিশ্বকাপের শোভা দিয়েছেন। ব্যাটে-বলে দক্ষতার চেয়েও তার নেতৃত্বগুণ আর কারিশমায় ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জেতে পুরো জাতিকে বিশ্বজয়ের আনন্দে ভাসিয়েছেন। অমন সুদর্শন চেহারার আত্মবিশ্বাসী মানুষটি রাজনীতির মাঠে নেমেও দেখেছেন তার প্রবল জনপ্রিয়তা। হয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও, কিন্তু রাজনীতির পাকচক্রে পড়ে আজ মহাসংকটে কিংবদন্তির জীবন। কারাবন্দি হিসেবে তার চিকিৎসার অধিকার ও মৌলিক মর্যাদাটুকুও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
যে জাতিকে তিনি গৌরবে মুড়ে দিয়েছিলেন, সেই জাতির কর্তাদের উদ্দেশ্যেই বিবৃতি দিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের তারকারা উদ্বেগ জানাচ্ছেন ইমরান খানের সুস্থতা নিয়ে। গতকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক অধিনায়ক ব্রায়ান লারাও খুব আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘খেলোয়াড়ি জীবনে যিনি নিজের দেশের জন্য আশা ও গর্বের মানুষ হয়েছিলেন, তিনি কীভাবে এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছেন, আমি বুঝতে পারছি না। তার জন্য ন্যূনতম যত্ন ও সম্মানটুকুও থাকবে না, এটা মেনে নেওয়া কঠিন।’
সাবেক ক্যারিবীয় অধিনায়ক দাবি করেছেন, ‘অন্য সাবেক অধিনায়কদের মতো আমি তার উপযুক্ত চিকিৎসার দাবি জানাচ্ছি। অন্তত মানুষ হিসেবেও যেন তাকে প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া হয়।’ এর আগে ভারতের সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব, অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ ওয়াহ, শ্রীলঙ্কার অর্জুনা রানাতুঙ্গাসহ অনেকেই চিঠি দিয়ে পাকিস্তান সরকারকে ৭৩ বছর বয়সী ক্রিকেটারের যথাযথ চিকিৎসা ও মর্যাদাপূর্ণ কারাবাসের আহ্বান জানিয়েছেন।
ইমরানের আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া প্রতিবেদনে দাবি করেছেন, তার ডান চোখের ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তিই নষ্ট হয়ে গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে তিনি ঝাপসা দেখা ও চোখে পানি পড়ার অভিযোগ করলেও শুধু চোখের ড্রপ দিয়েই চিকিৎসা সেরেছিল সরকারি পক্ষ। এতে তার অবস্থা আরও খারাপের দিকে গেছে। এরপর সুপ্রিম কোর্ট ‘মৌলিক অধিকারের’ কথা মাথায় রেখে ইমরানকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। এ নিয়েও রাজনীতি হয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা বলে তাকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের বদলে নেওয়া হয় একটি সরকারি হাসপাতালে। কয়েক দিন বাদে তিনি সুস্থ আছেন বলে আবার কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়। মানে হাসপাতালে রাখার পর আদালতের নির্দেশনাও মানেনি সরকার।
জীবনের এই বাঁকবদল শুধু এক কিংবদন্তির ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি এক গভীর মানবিক সংকট। তার সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশ্বের সাবেক ক্রিকেট তারকারা, মানবাধিকার সংগঠনগুলো, এমনকি বিদেশি আইনপ্রণেতারাও। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— খ্যাতি, ভালোবাসা কিংবা ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া কোনো মানুষই সময়ের নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পায় না। ইমরানের এ গল্প শুধু রাজনীতির নয়, মানবতারও একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।





