খালিদ বিশ্বাস জুগিয়েছেন ডুলি কেড়েছেন

যুদ্ধে নামার আগেই সেনাপতি বলে দিলেন, ‘প্রতিপক্ষ শক্তিশালী, সাবধানে...।’ এরপর সৈন্যদল আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হলেও লাভ নেই। পরাজয় অবধারিত। মালয়েশিয়ার কাছে বাংলাদেশের ৩-০ গোলে হারের দিনে বিশ্বকাপ খেলা পানামা কোনোরকমে ড্র করেছে ভারতের সঙ্গে। যারা গত নভেম্বরে হেরেছিল বাংলাদেশের কাছে, সেই ভারত র্যাংকিংয়ে ৯৪ ধাপ এগিয়ে থাকা পানামার বিপক্ষে রূপকথার জন্ম দিয়েছে খালিদ জামিলের মন্ত্রে। শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ের মন্ত্রটা যে ফুটবলারদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন ভারতীয় কোচ।
ফিফা আসিয়ান কাপে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে শুরুর ম্যাচে আশাবাদী হওয়ার উপায় ছিল না। বাংলাদেশের আমেরিকান কোচ থমাস ডুলির পরিকল্পনাটা কী ছিল, রক্ষণাত্মক নাকি কাউন্টার অ্যাটাক তার কোনো স্পষ্ট ছবি ফোটাতে পারেননি ৯০ মিনিটের ম্যাচে। প্রায় সবাই নিজেদের অর্ধে নেমে খেলাটা আপাতভাবে ‘বাস পার্কিং’ কৌশল মনে হলে বাস্তবে তার প্রয়োগ ছিল না। রক্ষণ একদমই অসংগঠিত এবং ব্লকগুলোও ছিল ভঙ্গুর। ট্রেনিংয়ে রক্ষণ সংগঠন নিয়ে বিশেষ কোনো কাজ হয়েছে, তা মনেই হয়নি। মালয়েশিয়ায়ও কোনো ফুটবল জাদুকর আছে, তা-ও নয়। দিগভ্রান্ত ও ভুল ট্যাকটিকসের সুযোগ নিয়ে তারা সহজেই ফাঁকফোকর বের করে নিতে পেরেছে। মাঠের লড়াইয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ছক ছিল না, গোলমেলে ও লক্ষ্যহীন ফুটবলের বলি হয়েছে বাংলাদেশ।
প্রথম দুই গোলে প্রতিপক্ষের দক্ষতার চেয়ে বাংলাদেশের রক্ষণের উদারতাই বেশি চোখে পড়েছে। দুই উপহার না হলেও ম্যাচের ভাগ্য বদলাত না। কারণ, আসল গলদটা বাংলাদেশের কৌশলে, খেলোয়াড়দের মানসিকতায়। মাঠে ফুটবলারদের মধ্যে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের ‘ফাইটিং স্পিরিট’-এর ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। এতগুলো প্রবাসী ফুটবলারের দলের প্রেসিং, ইনটেনসিটি কিংবা প্রতিপক্ষের ছন্দ নষ্ট করে দেওয়ার খেলাই দেখা যায়নি।
পানামার বিপক্ষে ভারতের খেলাটা দেখলেই আসল পার্থক্যটা বোঝা যাবে। ম্যাচের শুরুতেই বিশ্বকাপ খেলে আসা পানামা দাপট দেখালেও ভারতের মনোবল দমে যায়নি। ২০ মিনিট পার হতেই বুক চিতিয়ে লড়াই করে গেছে। পানামার জালে বল জড়িয়ে ভারতকে এগিয়ে দেন রায়ান উইলিয়ামস। থমকে যায় বিশ্বের ৯৪ ধাপ এগিয়ে থাকা র্যাংকিংয়ের হিসাবনিকাশ। এরপরও ব্যবধান বড় করারও সুযোগ পেয়েছিল তারা। যদিও শেষ দিকে পানামার এক দুর্দান্ত গোলে ম্যাচটি শেষমেশ ড্র হলেও ভারতের এই আত্মবিশ্বাস তাক লাগিয়ে দেয় ফুটবল বিশ্বকে।
দুই কোচের বিপরীতমুখী দর্শনই এখানে স্পষ্ট করে দেয় দুই দলের আসল পার্থক্য। একদিকে ভারতের দেশি কোচ খালিদ জামিল বিশ্বকাপের দলকে রুখে দিয়ে সব আলো কেড়ে নিলেন। তবে খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব দিয়ে সগর্বে বলেছেন, ‘আমার খেলোয়াড়রা এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস হারায়নি। তারা অনেক ম্যাচিউরড।’ অর্থাৎ প্রতিপক্ষ তুমুল শক্তিশালী হলেও মাঠে শেষ পর্যন্ত লড়বে। আর বাংলাদেশের আমেরিকান কোচ থমাস ডুলি যেন খেলোয়াড়দের বিশ্বাস কেড়ে নিয়েছেন ম্যাচের আগেই। তাদের সেরাটা বের করে আনা কিংবা তাদের উদ্দীপ্ত করার কোনো চেষ্টাই করেননি। ম্যাচ শেষেও বলেছেন একই সুরে, ‘মালয়েশিয়াকে হারানোর আশাই আমরা করিনি। মাঠেই দুই দলের পারফরম্যান্সের পার্থক্য আপনারা দেখেছেন।’
বাংলাদেশের এই বিদেশি কোচের কথা শুনে মনে হতে পারে, মালয়েশিয়ার সঙ্গে ব্যবধান তুলে ধরার জন্যই যেন তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একদিকে মালয়েশিয়াকে ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ বানিয়ে হারের মানসিক প্রস্তুতির ঘোষণা, অন্যদিকে ৯৪ ধাপের ব্যবধান ঘুচিয়ে প্রতিপক্ষের মানে পৌঁছাতে পারার দক্ষতাই আলাদা করে দিচ্ছে দুই কোচকে।
একটি ফুটবল ম্যাচ শুধুই ৯০ মিনিটের খেলা নয়, একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও। সবুজ ঘাসে নামার আগেই খেলোয়াড়দের মনে সেই আত্মবিশ্বাসের ভিত তৈরি করতে হয়, লড়াইয়ের আগুন জ্বালাতে হয়। অথচ ডুলি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেই সাদা পতাকা উড়িয়ে বসে ছিলেন। তারই মঞ্চায়ন হয়েছে কেবল মাঠে।
ভারতের খালিদ জামিল যখন বিশ্বাসের ডানায় ভর করে নিজের দলকে ইতিহাস গড়তে শেখান, ডুলি তখন লড়াইয়ের আগেই কেটে দিয়েছেন আত্মবিশ্বাসের ডানা। ভারত জিতেছে অদম্য মানসিকতায় আর বাংলাদেশ হেরে বসে আছে কোচেরই পাতা আত্মসমর্পণের ফাঁদে।




