জিমির সামনে খুলছে জাতীয় দলের দরজা

রাসেল মাহমুদ জিমি
বয়সের অজুহাতে রাসেল মাহমুদ জিমির সামনে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল জাতীয় দলের দরজা। দীর্ঘ দুই বছর পর সেই দরজা ফের খুলতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের হকির ইতিহাসে অন্যতম সেরা প্লে-মেকারকে এশিয়ান গেমসের ক্যাম্পে ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের নতুন অ্যাডহক কমিটি। জার্মান কোচ পিটার গেরহার্ডের কাছে ফিটনেসের প্রমাণ দিতে পারলে পঞ্চম এশিয়াডে দেখা যাবে জিমিকে।
২০২৩ হাংঝু এশিয়ান গেমস ছিল জাতীয় দলের হয়ে জিমির শেষ অ্যাসাইনমেন্ট। দেশে ফিরে প্রিমিয়ার লিগে অংশ নেন মোহামেডানের হয়ে। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত সার্চ কমিটি ফেডারেশনে বসায় বিতর্কিত অ্যাডহক কমিটি। যারা বয়সের অজুহাতে জিমিসহ বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে বাদ দিয়ে দেয়।
এ নিয়ে সে সময় অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। জিমি যখন বাদ পড়েন তখন বয়স ছিল ৩৭। তবে খেলায় কখনোই বয়সের ছাপ চোখে পড়েনি। সেরা রূপেই দেখা গেছে তাকে। তবে তৎকালীন কমিটি ৩২ বছরের বেশি বয়সীদের আর জাতীয় দলে না ডাকার ‘কালা কানুন’ জারি করে। এর যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যাও সে সময়ের কর্মকর্তারা দিতে পারেননি। এমনকি ফিটনেস টেস্টেও কখনো ডাকা হয়নি জিমিকে।
একঝাঁক সিনিয়রকে এক যোগে ছিটকে ফেলার কুফল মিলেছে গত দুই বছরে খেলা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। যে টুর্নামেন্টে টানা চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ, সেই এএইচএফ কাপের ফাইনালেই উঠতে পারেনি তারা। ফলে ৪০ বছর পর এশিয়া কাপে খেলার সুযোগ হাতছাড়া হয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান নাম প্রত্যাহার করায় ভারতে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে খেলার সুযোগ হয়। তবে পারফরম্যান্স ছিল যাচ্ছেতাই। শুধু তা-ই নয়, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে জাপানের আইচি-নাগোয়ায় হতে যাওয়া এশিয়ান গেমসের বাছাইয়ে বাংলাদেশ কোনোমতে পঞ্চম হয়ে সুযোগ পায় খেলার। অথচ এই বাছাইয়ে নিয়মিতই চ্যাম্পিয়ন অথবা রানার্স-আপ হতো বাংলাদেশ।
একের পর এক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ভরাডুবির পরও জিমির মতো পরীক্ষিত খেলোয়াড়কে বিবেচনায় আনেনি তৎকালীন কমিটি। সম্প্রতি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ইশতিয়াক সাদেককে সাধারণ সম্পাদক করে ঘোষণা করে নতুন অ্যাডহক কমিটি। যারা দায়িত্ব নিয়েই পুরুষ ও নারী জাতীয় দল এবং বয়সভিত্তিক দলগুলোর জন্য বিদেশি কোচ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে গত দুই বছর বয়সের অজুহাতে বঞ্চিত খেলোয়াড়দের ফেরানোর উদ্যোগ নেয়। তাতেই জিমির সামনে খুলতে যাচ্ছে জাতীয় দলের দরজা।
জিমিসহ পাঁচ অভিজ্ঞকে ডাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক আরিফুল হক প্রিন্স। আজ বিকালে সিলেকশন কমিটির সভায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। আগামীকাল পিটার গেরহার্ড এশিয়াডের দল বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করবেন।
বিষয়টি জানতে পেরে যেন বুক থেকে পাথর নেমে গেছে জিমির। জাতীয় দলের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও এক মুহূর্তও মাঠ ছাড়েননি। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে নিজেকে ফিট রাখার চেষ্টা করেছেন। এখন ৩৯ বছর চলছে। তবে আগের মতোই নিজেকে প্রমাণ দিতে মুখিয়ে থাকার কথা আগামীর সময়কে বলেছেন জিমি, ‘একটা বড় সময়ের অপেক্ষার ইতি টানতে যাচ্ছি। প্রথমেই আমি বর্তমান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ভাইকে কৃতজ্ঞতা জানাই, আমাকে সম্মান দিয়ে অ্যাডহক কমিটির সদস্য করায়। এরপর এই কমিটির সাধারণ সম্পদাক ইশতিয়াক সাদেক ভাইসহ বাকিদের ধন্যবাদ জানাই আমাকে একটা সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। এখনো জানি না জাতীয় দলের জার্সি আবার পরতে পারব কিনা। কারণ বিদেশি কোচ আসছেন, তার কাছে প্রমাণ দিতে পারলেই হয়তো স্বপ্নটা পূরণ হবে। আমি এতটুকু বলতে পারি, নিজেকে প্রমাণ দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টাই করব।’
বিগত কমিটি তাকে বাদ দিলেও কখনোই তার পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। জিমি এটাকেই বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন, ‘গত এশিয়ান গেমসে কোরিয়ান কোচের কাছে ফিটনেসের প্রমাণ দিয়ে নিয়মিত খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম। এরপর জীবনে অনেক কিছুই ঘটে গেছে। জাতীয় দল থেকে বয়সের অজুহাতে বাদ দেওয়া হয়। যদি ফর্মের কারণে বাদ দেওয়া হতো, কষ্ট পেতাম না, মেনে নিতাম। তবে বয়সের কারণে বাদ পড়াটা মেনে নেওয়া কষ্টের ছিল। তারপরও আমি কোনো বিরোধিতা করিনি। বরং আমাকে যারা ভালোবাসেন, যারা আমাকে চেনেন, তারাই এটা নিয়ে কথা বলেছেন, ফেডারেশনের সমালোচনা করেছেন। এটাই দিন শেষে আবার প্রাপ্তি।‘
২০০৩ সালে অভিষেকের পর ২০২৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ১৯৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা জিমি স্বপ্ন দেখেন আসছে এশিয়ান গেমসেই ২০০ ম্যাচের মাইলফলক ছোঁয়ার। ফেরার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে গেরহার্ডের পরীক্ষা উতরে যেতে পারলে সেই স্বপ্নও হয়তো পূরণ হবে জিমির।




