ব্রাজিলবাড়ি এখন পোড়োবাড়ি

পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ব্রাজিলবাড়ি। ছবি: মোশারফ হোসেন
দুয়ারে কড়া নাড়ছে বিশ্বকাপ ফুটবল। দেশে বাড়-বাড়ন্ত আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের আলোচনা। কিন্তু মানুষের এই আলাপে আর থাকবে না ‘ব্রাজিলবাড়ি’, যে বাড়ির প্রতিটি দরজায় আঁকা ছিল ব্রাজিলের পতাকা।
চাবির রিং, বাড়ির দেয়াল, ছাদ— সবকিছুতেই ব্রাজিলের পতাকার আদলে হলুদ আর সবুজের ছোঁয়া। বসার ঘরের নানান স্মারকে ব্রাজিলপ্রীতির নিদর্শন। রোনালদো, নেইমার, মার্সেলোসহ ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের ছবি ছিল পুরো বাড়ি জুড়ে। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার লালপুরের ছয়তলা সেই ভবনটি হলুদের আকর্ষণ হারিয়ে এখন সাদামাটা।
এমনিতেই বছর জুড়ে ব্রাজিলের পতাকার রঙে রাঙা থাকত এই বাড়ি। ফুটবল বিশ্বকাপে বাড়ত উন্মাদনা। ২০১৪ বিশ্বকাপ থেকে বাড়িটি একনজর দেখতে যেত উৎসুক জনতা। এমনকি সেই বাড়িতে এসেছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত জোয়াও তাবাজারা ডি অলিভেরিয়া জুনিয়রও।
সেই ব্রাজিল বাড়ি এখন ‘পোড়োবাড়ি’। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আগুন দেওয়া হয়েছিল এই বাড়িতে। করা হয়েছে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট।
কিছু জানালার গ্রিল ভাঙা। ভাঙা গ্লাসও। আগুন নিভলেও রেখে গেছে ক্ষত। এমনকি ফলকে লেখা ‘ব্রাজিল বাড়ি’ নামটি উধাও। মাস দুয়েক আগেও বাড়িটা ছিল পরিত্যক্ত। তবে গতকাল গিয়ে দেখা যায়, মেরামত করা হচ্ছে বাড়িটি।
বাড়িতে কেন আগুন
ব্রাজিলবাড়ি নিয়ে যেমন ভালোলাগার ঘোর ছিল, তেমনি অনেকের ছিল ক্ষোভও। কারণ, খোদ দুদকে অভিযোগ জমা পড়েছে, বাড়ির মালিক জয়নাল আবেদীন টুটুল এটা তৈরি করেছিলেন তেল চুরির অবৈধ টাকায়।
তেল কোম্পানি যমুনার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে দারোয়ানের চাকরি করতেন জয়নালের বাবা মো. রফিক। তার মৃত্যুর পর ক্যানটিনের কর্মচারী হিসেবে চাকরি পান জয়নাল। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ কর্মী হিসেবে স্থায়ী হয় চাকরি।
চতুর্থ শ্রেণির গেজার (তেল পরিমাপক) হিসেবে বিভিন্ন ভাতাসহ তার সর্বশেষ বেতন ছিল ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ শুধু ব্রাজিল বাড়ি করতেই জয়নাল আবেদীন টুটুলের খরচ হয়েছিল দেড় কোটি টাকার বেশি।
অভিযোগ আছে, তেল চুরির মাধ্যমে অবৈধ আয়ে ব্রাজিল বাড়ি করাসহ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন জয়নাল। জ্বালানি পরিবহনের জন্য তার দুটি জাহাজ ও দুটি ট্যাংক-লরি থাকারও অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজে চলাচল করতেন প্রিমিও গাড়িতে।
এই অভিযোগে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে যমুনা অয়েল থেকে সাময়িক বরখাস্ত হন জয়নাল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করে তাকে। এরপর স্থায়ীভাবে হারিয়েছেন চাকরিটা।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে দহরম-মহরম থাকায় জয়নালের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল একটা পক্ষ। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর সেই পক্ষের লোকজন আগুন লাগান ব্রাজিল বাড়িতে। তখন থেকেই এটা একপ্রকার পরিত্যক্ত বাড়ি।
চুরি গেছে ব্রাজিলের স্মারকগুলোও
২০১০ সালে ব্রাজিলের পতাকার আদলে নিজের বাড়ির রঙ করিয়েছিলেন জয়নাল। তখন বাড়িটি ছিল দোতলা। ২০১৪ সালে ছয়তলা বাড়ির কাজ শেষ হওয়ার পর আবার ব্রাজিলের পতাকার আদলে রঙ করান। স্মৃতি হিসেবে ওই দুটি ছবি রেখে দিয়েছিলেন বসার ঘরে। ছিল ব্রাজিলের পতাকা-সংবলিত চায়ের কাপ ও স্যান্ডেল। তবে সেই স্যান্ডেল কেউ পরতেন না। শুধু সাজিয়ে রেখেছিলেন ঘরে।
বাড়ির প্রতিটি দেয়াল এমনকি শোকেসেও ছিল ব্রাজিলের নানা স্মারক। ২০১৮ বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত জোয়াও তাবাজারা ডি অলিভেরিয়া জুনিয়র ব্রাজিল-কোস্টারিকার ম্যাচ উপভোগ করতে এসেছিলেন জয়নালের ব্রাজিলবাড়িতে। গেট দিয়ে ঢুকতেই তখন দেখা মিলেছিল ব্রাজিলিয়ান তারকাদের ছবি।
সেসব এখন শুধুই স্মৃতি। ব্রাজিলের যত স্মারক আর তারকাদের পোস্টার-চুরি হয়ে গেছে সব। ছয়তলার প্রতিটি ফ্লোরই একসময় ছিল অন্ধকারে ডুবে। ঝাড়বাতির রোশনাইয়ে আলোঝলমলে করা বাড়িতে সাধারণ বাতি জ্বালানোরও ছিল না কেউ। তবে কয়েকটা ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়া উঠেছে সম্প্রতি।
জয়নাল যা বলছেন
জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন জয়নাল আবেদীন টুটুল। নিজের শখের ব্রাজিল বাড়িতে তিনি তো বটেই, আসেন না তার পরিবারের কেউ। বাড়ির কেয়ারটেকার রেজাউল হাওলাদার আগামীর সময়কে জানালেন, ‘কিছুদিন টুটুল সাহেবের মা এখানে ছিলেন তবে এখন আর কেউ আসে না। আমিই দেখাশোনা করছি। চেষ্টা করছি বাড়ি ভাড়া দিতে। কয়েকটা ফ্ল্যাট ভাড়া হয়েছে। শুরু হয়েছে মেরামতের কাজও।’
বিশ্বকাপ দরজায় কড়া নাড়ছে আর গা ঢাকা দিয়ে আছেন জয়নাল আবেদীন। মোবাইল ফোনে জয়নাল বললেন, ‘এখন ব্রাজিল বাড়িতে যাওয়ার মতো পরিবেশ নেই। মেরামত করার চেষ্টা করছি। তবে আমার যে অবস্থাই হোক না কেন, ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা সবসময় থাকবে।’









