মেসির ১০ নম্বর জার্সি কি তুলে রাখবে আর্জেন্টিনা?

সংগৃহীত ছবি
১০ নম্বর—এটি ঐতিহাসিক এবং কিংবদন্তিতুল্য জার্সি, যা সবার জন্য নয়। এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি '১০ নম্বর'। ঠিক এই কারণেই পাড়ার খেলায় যদি কোনো কঙ্কালসার ছেলে চুপচাপ এই জার্সিটা গায়ে চাপায়, সবাই তাকে সমীহ করে। নিশ্চিত থাকে, সে মাঠে অসাধারণ কিছু একটা করে দেখাবে।
খেলাটা ফুটবল হোক বা ওয়াটার পোলো, শিশুদের প্রথম পছন্দ এই ১০ নম্বর। তবে বড় হয়ে খেলোয়াড়রা যখন পেশাদার হন, তখন এই নম্বর নিজেই তার যোগ্য প্রতিনিধিকে বেছে নেয়। সংখ্যাতত্ত্ববিদেরা বলবেন এর ভারসাম্যের কথা, শুরু (১) থেকে শেষ (০), যেন অসীম প্রচেষ্টা আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মেলবন্ধন।
এই জার্সির কথা উঠলে আর্জেন্টাইনরা একসুরে বলবেন লিওনেল মেসির নাম। ঠিক যেমনটা আগে বলা হতো ডিয়েগো ম্যারাডোনার বেলায়—যিনি নিজের নামকে জার্সির নম্বরের সমার্থক বানিয়ে ফেলেছিলেন। জাতীয় দলের এই দুই মহাতারকার বিশালত্বই প্রমাণ করে তাদের রেখে যাওয়া ব্যাটন বহন করা কতটা কঠিন চ্যালেঞ্জ।
মেসি এখন অবসরে। স্পেনের বিপক্ষে হার দিয়ে শেষ হওয়া ফাইনালের কিছুদিন পরেই তিনি বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এবং সোমবার (৩১ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন—ফুটবল বিশ্বের জন্য যা এক বিষাদময় দিন।
জার্সি নম্বরটি কি চিরতরে তুলে রাখা সম্ভব?
২০২৪ সালে স্প্যানিশ সংবাদপত্র 'স্পোর্ত'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এএফএ সভাপতি ক্লাওদিও 'চিকি' তাপিয়া বলেছিলেন, ‘মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিটি চিরতরে তুলে রাখা (অবসর দেওয়া) হবে।’
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী এটি করা এত সহজ নয়। যার একটি আইনি এবং ঐতিহাসিক নজিরও আছে। ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, হুলিও গ্রন্দোনার প্রস্তাবে এএফএ নির্বাহী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে ম্যারাডোনার প্রতি সম্মান জানিয়ে ১০ নম্বর জার্সিটি চিরতরে অবসর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ফিফা সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অনুমতি দেয়নি। কারণ বিশ্বকাপের মতো অফিসিয়াল প্রতিযোগিতায় ১ থেকে ২৩ নম্বর পর্যন্ত সংখ্যা থাকা বাধ্যতামূলক। তাই ২০০২ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত আরিয়েল ওরতেগাকে ১০ নম্বর জার্সি পরে নামতে হয়েছিল।
করোনার পর দলের আকার বেড়ে ২৬ হলেও একটা নম্বর তুলে রাখা ততটা সহজ নয়। তাহলে খেলতে হতে পারে ২৫ জনের স্কোয়াড নিয়ে! তাঝাড়া এবার একক কোনো উত্তরসূরি নেই। আবার এই নম্বরের ওপর প্রত্যাশার চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। আগামী ফিফা আন্তর্জাতিক উইন্ডোতে যখন দল ঘোষণা করা হবে, হয়তো দেখা যাবে সাময়িকভাবে ১০ নম্বর জার্সিটি কাউকেই দেওয়া হয়নি। অথবা দেশের মাটিতে মেসির বিদায়ী সংবর্ধনা ম্যাচের জন্য তা সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তবে আজ হোক বা কাল, নতুন একজন ১০ নম্বর আসবেই।
ঠিক যেমনটা ঘটেছিল ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আসার পর। তার পরপরই প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমেছিলেন মার্সেলো এসপিনা। ইতিহাসের সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সি আজ আবার তার নতুন মালিকের অপেক্ষায়।
তাহলে এরপর কে?
এখন কে পরবেন এই ১০ নম্বর?
লিওনেল স্কালোনির দল পুনর্গঠন পরিকল্পনায় এমন একজন খেলোয়াড় আছেন যিনি মেসির শূন্যস্থান পূরণ করবেন, তিনি নিকোলাস পাস। আর এই কারণেই হাঁটুর চোট থেকে সেরে ওঠার পরপরই তাকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে যোগ করা হয়। কোমো ১৯০৭ -এর হয়ে ১০ নম্বর জার্সি পরা এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার বিশ্বকাপে আলজেরিয়া ও জর্ডানের বিপক্ষে নিজের জাতও চিনিয়েছেন।
মেসির পর নিকো পাস ১০ নম্বর জার্সির অন্যতম দাবিদার। ঠিক যেভাবে আনহেল দি মারিয়ার ১১ নম্বর জার্সিটি গিয়ে পৌঁছেছিল জিওভানি লো সেলসোর গায়ে। তবে অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিচারে আরও দুজন দাবিদার আছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মূল একাদশে থাকা কাতার বিশ্বকাপজয়ী থিয়াগো আলমাাদা এবং রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ফিওরেন্টিনায় গিয়ে নিজের পুরোনো ফর্ম ফিরে পাওয়া ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো।
লিভারপুলে ১০ নম্বর জার্সি পরা অ্যালেক্সিস ম্যাক আলিস্টারও তার খেলার ধরন ও পজিশনের কারণে শক্তিশালী প্রার্থী। এনসো ফার্নান্দেসের নামও এই তালিকায় আসছে।
স্কালোনি যুগের শুরুতে ১০ নম্বর জার্সি পরা পাউলো দিবালা বা আনহেল কোরেয়াকে ২০৩০ বিশ্বকাপের ভাবনায় হয়তো আর রাখা হচ্ছে না, তাই তারা এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছেন।
আর্জেন্টিনার নতুন ১০ নম্বর কে, সেটাই দেখার অপেক্ষা।







