আফ্রিকার কান্নায় মিশে আছে গৌরবও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘ঈশ্বর, শেষ পর্যন্ত তুমিও কি সাদাদের পক্ষে’, সিয়াটলে শেষ বাঁশি বেজে ওঠার পর মাঠের ভেতর হাঁটু ভেঙে বসে এটাই কি বলছিলেন লামিনে কামারা? সতীর্থরা এসে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রাও কেউ কেউ এলেন। কিন্তু কামারার কষ্টের বোঝা কমছে না কিছুতেই। কী করে কমবে? সেনেগালকে শেষ ষোলোয় পৌঁছে দেওয়ার খুব কাছ থেকে বাড়ির পথ ধরিয়ে দেওয়ার দায়ভার অনেকটাই যে তার। টিলম্যানসকে ফাউল করাতেই তো অন্তিম মুহূর্তে পেনাল্টি পেল বেলজিয়াম, সেই গোলেই যে বিদায় বার্তা লেখা হয় তেরাঙ্গার সিংহদের।
বুধবার ছিল বিশ্বকাপে আফ্রিকার কান্নার রাত। প্রথমে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নিল ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, পরের ম্যাচে বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিদায় নিল সেনেগাল। দুটি দলই বিদায় নিল প্রায় একই ধাঁচে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আগে গোল করে এগিয়ে গিয়েছিল কঙ্গো, ম্যাচে তারা ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল ৭৫ মিনিট পর্যন্ত। তারপর হ্যারি কেইনের অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের কাছেই তারা হেরে গেল। দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে ওঠা লিওনেল এমপাসিকে অবশেষে পরাস্ত করতে পেরেছেন ইংরেজ অধিনায়ক। আটলান্টায় শেষ বাঁশি বাজার ঘণ্টা দুয়েক পর কিক অফ হলো সিয়াটলে, যেখানে আরেকটি ম্যাচে মুখোমুখি ইউরোপ ও আফ্রিকা। সদ্য বিদায় নেওয়া কঙ্গোকে যারা দীর্ঘদিন ঔপনিবেশিক শাসনের শিকলে আটকে রেখেছিল, সেই বেলজিয়াম মুখোমুখি হয়েছিল সেনেগালের, যাদের একটা সময় উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছিল ফরাসিরা। সেই দাস ব্যবসার যুগে যখন আফ্রিকা থেকে মানুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো আর লুটে নেওয়া হতো সম্পদ, তখন অত্যাচারিত কালো মানুষদের বুক থেকে উঠে আসত হাহাকার, সৃষ্টিকর্তাও কি সাদাদের বেশি ভালোবাসেন? সভ্যতার চাকা যত এগিয়েছে, বর্ণবাদ এবং উপনিবেশের মতো ব্যাপারগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হয়েছে, তারপরও এমন হৃদয়ভাঙা রাতের পর সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে অভিমানী তো হতেই পারেন কামারা। গত বছরের জানুয়ারিতে আফ্রিকান নেশনস কাপের ফাইনালটিও সেনেগালের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হলো, শিরোপা দিয়ে দেওয়া হলো মরক্কোকে। কারণ, গোল বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠ ছাড়া। এরপর বিশ্বকাপ থেকে এভাবে বিদায়। সেনেগালের খেলোয়াড়দের কষ্টটা তীব্র হওয়াই স্বাভাবিক।
ম্যাচে নামার আগে আমাদের লক্ষ্য ছিল— যদি হারতেই হয়, তাহলে যেন যোদ্ধার মতো লড়াই করে হারি। ইংল্যান্ড দারুণ দল, প্রথমার্ধে আমরা তাদের বিপক্ষে শক্ত প্রতিরোধ গড়েছিলাম। জানতাম দ্বিতীয়ার্ধটা কঠিন হবে -ফিস্টন মায়েলা, কঙ্গোর ফরোয়ার্ড
কঙ্গো বিশ্বকাপে এসেছে মহাদেশীয় প্লে-অফ খেলে, কনকাকাফ অঞ্চলের প্রতিনিধি জ্যামাইকাকে হারিয়ে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের সংখ্যা তাতে হয়েছে ১০। ১৯৩৪ সালে প্রথম কোনো আফ্রিকান দেশ হিসেবে মিসর খেলেছিল, একটাই মাত্র ম্যাচ খেলে তারা হেরে বিদায় নিয়েছিল। তার ৩৬ বছর পর ১৯৭০ সালে দ্বিতীয় আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে খেলেছিল মরক্কো। সেখান থেকে ২০২৬ সালে এসে আফ্রিকা মহাদেশের ১০টি দলের বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলা এবং ইউরোপের দুটি শীর্ষ দলকে প্রায় হারিয়ে দেওয়ার মতো জায়গায় চলে যাওয়াটাও কম গর্বের নয়। কঙ্গোর ফরোয়ার্ড ফিস্টন মায়েলা তাই ম্যাচ শেষে বলেছেন, ‘ম্যাচে নামার আগে আমাদের লক্ষ্য ছিল— যদি হারতেই হয়, তাহলে যেন যোদ্ধার মতো লড়াই করে হারি। ইংল্যান্ড দারুণ দল, প্রথমার্ধে আমরা তাদের বিপক্ষে শক্ত প্রতিরোধ গড়েছিলাম। জানতাম দ্বিতীয়ার্ধটা কঠিন হবে। তাদের স্ট্রাইকার (হ্যারি কেইন) জোড়া গোল করে নিজের জাত চিনিয়েছেন এবং দলের জয় নিশ্চিত করেছেন। তবে আমরা নিজেদের নিয়ে গর্বিত, কারণ কেউ ভাবেনি যে, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো এ আসরে এতটা পথ পাড়ি দিতে পারবে।’ ১০টি দেশ বিশ্বকাপে এসেছিল আফ্রিকা থেকে, তিউনিসিয়া বাদে বাকি ৯ দেশই উঠতে পেরেছিল পরের রাউন্ডে। নকআউট থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিদায় নিয়েছে চার দল, বিদায়ের আগে আইভরি কোস্টও কড়া পরীক্ষাই নিয়েছে নরওয়ের। যে যুক্তরাষ্ট্রে একসময় আফ্রিকা থেকে দাসদের ধরে নিয়ে আসা হতো, সেই যুক্তরাষ্ট্রেই আফ্রিকার ফুটবলাররা লিখেছেন ইতিহাসের নতুন অধ্যায়।




