সব তারা জ্বলছে বিশ্বকাপে

সংগৃহীত ছবি
বিশ্বকাপ অনেকটা ঝড়ের রাতের আকাশের মতো। সাধারণত সব নক্ষত্র একসঙ্গে জ্বলে না সেখানে। কোনোটি মেঘে ঢেকে যায়, কোনোটি পথ হারায়, আবার কোনোটি একাই আলো ছড়িয়ে ইতিহাস রচনা করে। অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপের চরিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। মেসি, এমবাপ্পে, কেইন, হলান্ড, ভিনিসিয়ুস— যেন পাঁচটি উজ্জ্বল নক্ষত্র একই আকাশে সমান দীপ্তিতে জ্বলছে। গোলের পর গোল, ম্যাচের পর ম্যাচ— দলের সংকটে তারাই হয়ে উঠছেন ভরসার নাম। তাই এ বিশ্বকাপের গল্প শুধু গোলের নয়, একসঙ্গে জ্বলে ওঠা তারকাদেরও।
তাদের এক হাতে দলের পতাকা, অন্য হাতে ব্যক্তিগত গৌরবের পতাকা। প্রতিটি গোল শুধু জয়ের পথে দলকে একধাপ এগিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাকে গোল্ডেন বুটের পথেও এগিয়ে নিচ্ছে। প্রতিটি ম্যাচসেরা পারফরম্যান্স শুধু দলকে এগিয়ে নেওয়া নয়, গোল্ডেন বলের দাবিটাকেও জোরালো করা। দলগত যুদ্ধের ভেতর তাই সমান তীব্রতায় চলছে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের আরেক বিশ্বকাপ।
এ লড়াইয়ে অবিশ্বাস্যভাবে এগিয়ে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি! কেউ কি ভেবেছিল এই বয়সে তিনি নতুন বিশ্বকাপ শুরু করবেন হ্যাটট্রিক দিয়ে! প্রথম কয়েকটি বিশ্বকাপে যে স্বপ্নগুলো বারবার ভেঙেছে, যে আক্ষেপগুলো বুকের ভেতর জমে ছিল বছরের পর বছর, সেগুলোর যেন সুদে-আসলে হিসাব চুকিয়ে নিচ্ছেন এ আর্জেন্টাইন মহাতারকা। প্রতিটি গোল যেন শুধু প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠানো নয়, অতীতের একেকটি অপূর্ণতারও জবাব।
এই করে তিন ম্যাচে তার গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬। বিশ্বকাপে ক্লোসার সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙে মেসি এখন ১৯ গোল নিয়ে অনেকটা এগিয়ে। ফুটবলবিশ্বের পুরনো সব রথী-মহারথীকে গোলের দৌড়ে পেছনে ফেলে তিনি ছুটছেন সামনের দিকে। তবে কিংবদন্তি থামবেন কোথায়, সেটাও কেউ জানে না। রেকর্ড ভাঙার এই বিশ্বকাপ বুঝি তার ব্যক্তিগত পূর্ণতারও এক মহাকাব্য হয়ে উঠবে।
৬ গোল নিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পেও গোল্ডেন বুটের দৌড়ে মেসির সঙ্গী। তবে এ ফরাসি তরুণের গল্পটা শুধু গোলের নয়, গতিরও; শুধু পরিসংখ্যানের নয়, দাপটেরও। চার বছর আগে লুসাইল স্টেডিয়ামে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে যে তরুণ নিজেকে বড় মঞ্চের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তারকাদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, চার বছর পর তিনি যেন আরও পরিণত, আরও ক্ষুধার্ত। মেসি যেখানে অভিজ্ঞতার আলোয় পথ দেখাচ্ছেন, এমবাপ্পে সেখানে তারুণ্যের আগুনে ছারখার করে দিচ্ছেন প্রতিপক্ষকে। তার প্রতিটি স্প্রিন্ট, ড্রিবল ও গোল যেন জানিয়ে দিচ্ছে, বিশ্বকাপের মুকুট শুধু অতীতের রাজাদের নয়, তৈরি হচ্ছেন ভবিষ্যতের সম্রাটও।
কিং কেইনও ৫ গোল করে লিখে চলেছেন নিজের রাজকীয় অধ্যায়। কঙ্গোর বিপক্ষে ইংল্যান্ড খাদের কিনারায় পৌঁছালে তিনি ফিরিয়েছেন জোড়া গোল করে। বাঁচিয়ে রেখেছেন একটি জাতির বহুদিনের স্বপ্ন ‘ফুটবল ইজ কামিং হোম’। ক্লাব ফুটবলের আরেক গোল-যন্ত্র আর্লিং হলান্ডও ৫ গোল করে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন শুরু থেকেই।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র যেন একাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের স্বপ্ন। ৪ গোল করে তার ক্লাব ফুটবলের ঝলমলে গতিকে নিয়ে গেছেন ভিন্ন দায়িত্ববোধের জায়গায়। দলে যখন তারকার ভিড় নেই তখন সব আলোর কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন নিজেকেই। টানা দুই চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী ফরাসি তারকা উসমান দেম্বেলেরও ৪ গোল।
৪১ বছর বয়সেও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো গোলের খাতা খুলেছেন। বয়স তার গতি কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু গোলের ক্ষুধা, জয়ের জেদ আর মঞ্চের প্রতি ভালোবাসা কেড়ে নিতে পারেনি। এটি এমন এক বিশ্বকাপ, যেখানে আকাশের একটিমাত্র তারা নয়, পুরো নক্ষত্রমণ্ডল একসঙ্গে জ্বলে উঠেছে। আর সেই সম্মিলিত আলোর ঔজ্জ্বল্যেই হয়তো এ আসর ইতিহাসের পাতায় আলাদা হয়ে থাকবে।




