বিশ্বকাপ ফুটবলে আবেগের ট্রফিটা বাংলাদেশের

বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে এখন ফুটবলের উন্মাদনা। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর সমুদ্রতট, আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসের রাস্তাঘাট কিংবা ইউরোপের ফুটবল নগরীগুলোয় উৎসবের আমেজ থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ তারা বিশ্বকাপ খেলে, দলের হার-জিতে তাদের চেহারার রঙও বদলায়।
কিন্তু পৃথিবীর মানচিত্রে এমন একটি দেশ আছে, যে দেশের নাম বিশ্বকাপের কোনো গ্রুপে নেই, নেই তার চৌহদ্দির হাতছোঁয়া দূরত্বেও। তবু বিশ্বকাপ এলেই সে দেশের রাস্তাঘাট, পাড়া-মহল্লা, ছাদ-বাড়ি আর মানুষের হৃদয় সবচেয়ে বেশি রঙিন হয়ে ওঠে। তার নাম বাংলাদেশ।
ঢাকার অলিগলি, কিংবা যেকোনো শহর-গ্রামের কোনো বাড়ির ছাদ বা রাস্তাঘাট ঘুরলেই পাওয়া যায় বিশ্বকাপের আমেজ। দেয়ালে দেয়ালে ফুটে উঠেছে মেসি, নেইমার, রোনালদো, ভিনিসিয়ুস, এমবাপ্পে কিংবা ইয়ামালের মুখচ্ছবি। রাতভর জেগে তরুণরা রঙ-তুলি হাতে আঁকছে গ্রাফিতি। নিজের প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানো নিয়ে চলছে তোড়জোড়, জার্সি কেনায় শুরু হয়েছে দৌড়ঝাঁপ। এসবের মধ্যে বাংলাদেশিদের বিশ্বকাপ প্রিয়তার প্রকাশ ঘটে ভীষণভাবে।
একটি গ্রাফিতি করতে কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়। রঙ-তুলি কিনতে হয়, এরপর আঁকিয়ে ডাকতে হয়। কিন্তু হিসাবের খাতায় সেই ব্যয় কেউ লেখে না। কারণ, এই খরচের বিপরীতে তারা পায় আনন্দ আর উৎসবের অংশ হওয়ার তৃপ্তি। তরুণরা জমিয়ে রাখা পকেটমানি নিয়ে আসে, কেউ টিউশনি করে পাওয়া টাকাটি তুলে দেয়, কেউবা দেয় শুধু শ্রম। সবাই মিলে বিশ্ব ফুটবলে শতসহস্র কোটি দূরদেশে তৈরি করে বিশ্বকাপের রঙিন এক মঞ্চ।
ঢাকার টিকাটুলীর কে এম দাশ লেন বা গেন্ডারিয়ার এমনই রঙিন গলির তরুণরা নিজেদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন এভাবে, ‘বিশ্বকাপ তো চার বছর পরপর আসে। আমরা প্রতিবার এই আয়োজন করি। এতে কষ্টের কিছু নেই। এটি ফুটবলকে ভালোবাসার উৎসব, এই আনন্দের সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। পুরো এলাকা আমাদের সমর্থন করে। শুধু রঙ করা, পতাকা ওড়ানো নয়, পুরো এলাকার মানুষ আমাদের সঙ্গে খেলাও দেখে রাত জেগে।’
ঢাকার অলিগলি, কিংবা যেকোনো শহর-গ্রামের কোনো বাড়ির ছাদ বা রাস্তাঘাট ঘুরলেই পাওয়া যায় বিশ্বকাপের আমেজ। দেয়ালে দেয়ালে ফুটে উঠেছে মেসি, নেইমার, রোনালদো, ভিনিসিয়ুস, এমবাপ্পে কিংবা ইয়ামালের মুখচ্ছবি। রাতভর জেগে তরুণরা রঙ-তুলি হাতে আঁকছে গ্রাফিতি। নিজের প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানো নিয়ে চলছে তোড়জোড়, জার্সি কেনায় শুরু হয়েছে দৌড়ঝাঁপ
এই উৎসবে শামিল হওয়া তরুণরাই জার্সির বড় ক্রেতা। যাদের অনেকেরই নিজস্ব কোনো আয় নেই। তবু প্রিয় দলের জার্সি তাদের চাই-ই চাই। একেকটি জার্সির দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। তাতে কী! বাবার কাছে আবদার, বড় ভাইয়ের কাছে অনুরোধ কিংবা নিজের সঞ্চয় ভেঙে হলেও জার্সি কিনতে হবে। শুধু একটি নয়, অনেকের আলমারিতে জায়গা পায় একাধিক জার্সি। বিশ্বকাপের এক মাসের জন্য হলেও তারা যেন নিজেদের পরিচয় বদলে ফেলে— কেউ ব্রাজিলিয়ান, কেউ আর্জেন্টাইন হয়ে ওঠে।
পতাকার বাজারেও একই চিত্র। এতদিন যে পতাকা ছিল শুধু কাপড়ের টুকরো, বিশ্বকাপ এলেই সেটি হয়ে ওঠে আবেগের প্রতীক। ৫০০ কিংবা ৬০০ টাকার পতাকা কিনতে মানুষ দ্বিধা করে না। গুলিস্তানের পতাকার মার্কেটে বিশ্বকাপের সময় দম ফেলার ফুরসত পান না দোকানিরা। এক দোকানি জানাচ্ছিলেন, চাহিদার সঙ্গে জোগানের অপ্রতুলতায় তাদের নাভিশ্বাস উঠছে, ‘চাহিদা অনেক। এত বেশি যে আমরা যেখান থেকে আনি, সেখানে আর কাপড় অবশিষ্ট নেই। তারা দিতেই পারছে না। দাম বেড়ে গেলেও মানুষ পতাকা কিনছে।’
জার্সির বাজারের চিত্রও একই। জার্সির দোকানগুলোয় জায়গা থাকে না পণ্য রাখার। অনলাইন বিক্রেতারা অর্ডারের চাপ সামলাতে হিমশিম খান। কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পেরে যোগাযোগ বন্ধ করে দিচ্ছেন। বিশ্বকাপ যেন শুধু ফুটবলের উৎসব নয়, বাংলাদেশের জন্য এটি এক বিশাল অর্থনৈতিক যজ্ঞও। ফেসবুকের ফিড ভরে গেছে জার্সির বিজ্ঞাপনে। তাতে আয় যেমন ফেসবুকের হচ্ছে, তেমনি জার্সি ব্যবসায়ীদেরও।
অনলাইনে জার্সি বিক্রি করা এক পেজের স্বত্বাধিকারী শাওন বলেছেন, ‘আমাদের ছোট পেজ, আমরা প্রতিযোগিতার জন্য কিছুটা কমে বিক্রি করছি, যেমন ১ হাজার টাকা করে একটি প্লেয়ার্স এডিশন জার্সি। কিন্তু বড় পেজ বা দোকানে দেখবেন ১ হাজার ২০০ টাকায় একেকটি জার্সি বিক্রি হচ্ছে।’ দাম যেমনই হোক, গুণগত মানের জার্সি কিনতে কসুর করছেন না সমর্থকরা। এক ক্রেতার চোখে, ‘এবার জার্সির কাপড় বেশ ভালো। আমরা গায়ে দিয়ে যেটায় আরাম পাচ্ছি, সেই জার্সি কিনছি। সেটির হয়তো দাম বেশি, কিন্তু প্রিয় দলের জার্সি তো কিনতেই হবে।’
তবে গল্পটা শুধু জার্সি আর পতাকার নয়। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সংস্কৃতির আরেকটি বড় অংশ হলো নতুন টেলিভিশন কেনা। বহু বছর ধরেই একটি অলিখিত রেওয়াজ— বিশ্বকাপ এলেই নতুন টিভি কিনতে হবে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস কোম্পানি ছাড় ও উপহারের ঘোষণা দিয়েছে টিভিতে। আর সেই সুযোগে দোকানগুলোয় ভিড় জমিয়েছেন ক্রেতারা।
কিন্তু সময় বদলেছে। এখন শুধু টেলিভিশনে মন ভরে না অনেকের। ৫০ ইঞ্চির পর্দাও যেন ছোট মনে হয়। প্রিয় তারকার হাসি, কান্না কিংবা গোল উদ্যাপনকে আরও রঙিন ও বড় আকারে দেখতে চান দর্শকরা। তাই বেড়েছে প্রজেক্টরের চাহিদা। নিজের ঘরের সাদা দেয়ালটাকেই অনেকে পরিণত করতে চাইছেন বিশাল পর্দায়। সেখানে খেলা দেখার অনুভূতিটা যেন আরও বাস্তব, আরও কাছের। দূরের কোনো স্টেডিয়ামে খেলা হলেও মনে হয়, প্রিয় তারকাকে যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।
তবে বিশ্বকাপের আনন্দ শুধু ঘরের চার দেয়ালে বন্দি থাকছে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠছে ফ্যান জোন। বড় পর্দায় একসঙ্গে খেলা দেখার আয়োজন হচ্ছে। বন্ধু, সহপাঠী, অপরিচিত মানুষ— সবাই এক হয়ে যাচ্ছে একটি গোলের আনন্দে কিংবা একটি মিসের হতাশায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, মহসিন হল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কিংবা কক্সবাজারসহ দেশের ১৩টি স্থানে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ খেলা দেখার ফ্যান জোন প্রস্তুত করছে টার্ফ নেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশের ফুটবল হয়তো এখনো বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছায়নি। লাল-সবুজের পতাকা এখনো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উড়তে দেখা যায়নি। তাতে বাংলাদেশের মানুষের এই টুর্নামেন্টের সময়ের উন্মাদনা কমেনি। বরং বিশ্বকাপ এলেই এ দেশের মানুষ প্রমাণ করে, ফুটবল শুধু জয়ের হিসাব নয়; এটি একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার উপলক্ষ।
হয়তো কোনো একদিন বাংলাদেশের পতাকাও উড়বে বিশ্বকাপের মাঠে। সেই স্বপ্ন এখনো দূরের। ততদিন পর্যন্ত বিশ্বকাপ এলে এই দেশের ছাদে উড়বে অন্য দেশের পতাকা, দেয়ালে আঁকা হবে অন্য দেশের তারকার ছবি, রাত জেগে চলবে খেলা দেখা। কারণ, বাংলাদেশ ফুটবল বিশ্বে পিছিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু ফুটবলকে ভালোবাসার প্রতিযোগিতায় এই দেশের মানুষ যে অনেক দূর এগিয়ে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিশ্বকাপের আসল ট্রফি হয়তো একটি দল জিতবে। কিন্তু ফুটবল আবেগের ট্রফিটা বাংলাদেশ জেতে সবসময়। ফিফা তার মেডেল দিয়েছে কাতার বিশ্বকাপে। মেসির আর্জেন্টিনা অনেক দূর দেশের হলেও খুব আপন করে নেয় বাংলাদেশের সমর্থকদের।




