ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার অপেক্ষায় দেশ

সংগৃহীত ছবি
রাত পোহালেই শুরু বিশ্বকাপ। ফুটবলের রঙে রঙিন হবে গোটা দুনিয়া। এবারই প্রথম বিশ্বমঞ্চে থাকছে সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্ব। ৪৮ দেশ খেলবে মর্যাদার মঞ্চে। তবে বাংলাদেশের মানুষের অত দলে আগ্রহ নেই। তারা বরাবরের মতো মজে আছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলে। এখানে ভৌগোলিক অবস্থানটা মুখ্য নয়। ফুটবল প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ দুটির খুব কাছে পৌঁছে দিয়েছে বাংলাদেশকে। বিশ্বকাপ এলেই এ দুই দেশে বিভক্ত হয় বাংলাদেশ। শুরু হয় পাগলামির এক মহাপ্রতিযোগিতা। যুগে যুগে এ দ্বৈরথই বাংলাদেশকে অন্যভাবে চিনিয়েছে বিশ্বদরবারে। এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটার কোনো সুযোগই নেই। বাংলাদেশিদের এ তুঙ্গস্পর্শী উন্মাদনার কথা জানে গোটা বিশ্ব।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ চলাকালে এ দেশে ঘটা নানা ঘটনা ঘটা করেই প্রচারিত হয়েছে বিশ্ব মিডিয়ায়। বাঙালির এ আবেগ ছুঁয়ে গেছে মহাতারকাদেরও। লিওনেল মেসি, নেইমার জুনিয়ররা বাংলাদেশের মানুষের ফুটবলপ্রীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন প্রশংসাসূচক বক্তব্যে। দোহা বিশ্বকাপ চলাকালীন মেসি ও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে লাখো-কোটি বাঙালির উন্মাদনার প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০২৩ সালে ঢাকায় ফের দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্ত নেয় আর্জেন্টিনা সরকার। বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান্তিয়াগো ক্যাফিয়েরো বাংলাদেশের মানুষের এই ভালোবাসার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
অথচ এ দেশের মানুষের কাছে একটা সময় ফুটবল মানেই ছিল পেলের ব্রাজিল। প্রাক টেলিভিশন যুগে (১৯৮২ বিশ্বকাপের আগে) বিশ্বকাপের খবর সেভাবে পৌঁছাত না এ অঞ্চলে। স্কুল পড়ুয়ারা সে সময় বিশ্বকাপ বা ফুটবল সম্পর্কে জেনেছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল জাদুকর পেলেকে বইয়ের পাতায় দেখে। কালো মানিক পেলের জীবনী পড়েই ব্রাজিলে মজেছিল গোটা দেশ। পেলের জাদুতে একের পর এক সাফল্যের মালা গেঁথেছে ব্রাজিল, জিতেছে টানা তিন বিশ্বকাপ।
১৯৮২ বিশ্বকাপেও এ দেশের মানুষে আর্জেন্টিনা ভর করেনি। এমনকি ১৯৭৮ বিশ্বকাপ জেতার পরও বাঙালির হৃদয় কাড়তে পারেনি মারিও কেম্পেসের দল। তাদের ফুটবল ভাবনার পুরোটা জুড়ে তখনো তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ১৯৮৬ বিশ্বকাপেই পুরো চিত্র বদলে যায়। ভুবনভোলানো ফুটবলে এ বাঁকবদলের নায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা। মেক্সিকোয় সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয় শিরোপার স্বাদ দেন। ঝাঁকড়া চুলের ম্যারাডোনার শৈল্পিক ফুটবলে বাংলাদেশেও বাড়তে শুরু করে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা। আর ১৯৭০ বিশ্বকাপ জয়ের পর টানা ব্যর্থতায় কমতে থাকে ব্রাজিলের আবেদন।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে রঙিন সম্প্রচারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ডিয়েগো ম্যারাডোনার শতাব্দীর সেরা গোল ওলটপালট করে দেয় সব হিসাব। ম্যারাডোনার ফুটবল জাদুতে মোহিত হয়ে পড়েন বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা। ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাপ জয় আরও সুসংহত করে আর্জেন্টিনার সমর্থন। চার বছর পর ইতালি বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা ওঠে ফাইনালে, ম্যারাডোনারই জাদুতে আর সের্হিও গয়কোচিয়ার বিশ্বস্ত হাতে ভর করে। কিন্তু ফাইনালে রেফারি কোডেসালের বিতর্কিত পেনাল্টির সিদ্ধান্তে পশ্চিম জার্মানির কাছে আর্জেন্টিনার ১-০ হারের পর ম্যারাডোনার কান্না তাকে করে তোলে ট্র্যাজেডির নায়ক। বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই দুর্বলের পক্ষে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রেফারির সিদ্ধান্ত তাদের কাছে অনূদিত হয়েছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ আর শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের সম্প্রসারণ হিসেবেই। অন্যদিকে ম্যারাডোনার বামপন্থী রাজনীতি ঘনিষ্ঠতা, ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে বন্ধুত্ব আর ফিফার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো কণ্ঠস্বর তাকে দিয়েছে বিপ্লবী চরিত্র। তাই তো ১৯৯৪ সালে মাদক গ্রহণের দায়ে ম্যারাডোনার ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেলেও বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে তাকে মুছে ফেলা যায়নি। ২০১০ বিশ্বকাপে যখন ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনা দলের কোচ আর মেসি সেই দলের মধ্যমণি, তখনো অনুশীলন সেশনে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের ক্যামেরা খুঁজে ফিরত ম্যারাডোনাকেই।
ম্যারাডোনাই এ দেশে পেলের ব্রাজিলের একচ্ছত্র আধিপত্যে হানা দিয়ে সমর্থনের নিক্তিটা সমান সমান করে দেন। এরপর গ্রাফটা একের পর এক বিশ্বকাপ স্রেফ ওঠানামা করেছে, কখনোই হারিয়ে যায়নি। অন্য কোনো দল একের পর এক শিরোপা জিতেও দৃষ্টি সরাতে পারেনি।
সত্তরের পর ব্রাজিল ফের বিশ্বকাপ জেতে ১৯৯৪ সালে। সেবার রোমারিও, দুঙ্গার ভুবনভোলানো ফুটবল আর বেবেতোর ‘রক দ্য বেবি’ উদযাপনে এ দেশের মানুষের ফের ব্রাজিলে আসক্তি বাড়ে। আর ২০০২ জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে রোনালদো নাজারিও আর রোনালদিনহোর ঝলকে পঞ্চম বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিল ফের হারানো স্থান ফিরে পেতে শুরু করে। ম্যারাডোনা অধ্যায় শেষ হলেও আর্জেন্টিনার আবেদন কমেনি। দীর্ঘ ৩৬ বছর তারা শিরোপা জেতেনি। একের পর এক বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পরও আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তে দেননি আরেক ফুটবল জাদুকর মেসি। অবিশ্বাস্য সব কীর্তিতে সারা দুনিয়াকে বশে নিয়ে আসেন বাঁ পায়ের জাদুকর। আর কাতার বিশ্বকাপ জিতিয়ে ইতি টানেন সর্বকালের সেরা নিয়ে ওঠা দীর্ঘদিনের বিতর্কটা।
এবারও আছেন মেসি। অনেকের মতে, শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামবেন রাতের পর রাত বিশ্ববাসীকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখা বাঁ পায়ের জাদুকর। কীর্তি বলেন বা জনপ্রিয়তা, মেসির চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা নেইমারও আছেন ব্রাজিলের শিবিরে। বিশ্বকাপের শুরুর বাঁশি বাজার দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই আছে বাংলাদেশও। সাবেক তারকা ও কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টুর বিশ্বাস, এবারও বাঙালির উন্মাদনা আকাশ ছুঁবে— ‘এ দেশে বিশ্বকাপ বিস্ফোরণ ঘটবেই, নিশ্চিন্ত থাকুন। এর মধ্যেই ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সাতটা গোল খাওয়া নিয়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ট্রল শুরু হয়ে গেছে। আবার ব্রাজিল সমর্থকরা ম্যারাডোনার হ্যান্ড অব গড কিংবা মেসির পেনাল্টি নিয়ে বিতর্ক উসকে দিচ্ছে।’
বিশ্বকাপের মহামঞ্চে দুই চির বৈরীর মুখোমুখির ঘটনা মোটে চারবার। এর মধ্যে ১৯৯০ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় পর্বে। পরিসংখ্যানে ব্রাজিল দুই জয়ে এগিয়ে থাকলেও ১৯৯০ সালে ক্যানিজিয়ার একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনা বিদায় জানিয়েছিল তারকাখচিত ব্রাজিলকে। এবারও যদি দুদলের দেখা হয় কোনো নকআউট পর্বে, তবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপও অর্ধেকটা শেষ হয়ে যাবে ফাইনালের আগেই। তাই দেখা যদি হয়, সেটা হোক ফাইনালে।




