নেইমার নামের গোলকধাঁধায় আনচেলত্তি

সংগৃহীত ছবি
ফুটবল মাঠের ডাগ-আউটের অবিসংবাদিত নাম কার্লো আনচেলত্তি। ফুটবল দুনিয়ায় তিনি পরিচিত ‘ঠাণ্ডা মাথার জাদুকর’ হিসেবে। ম্যাচের পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, চুইংগাম চিবোতে চিবোতে ডাগ-আউটে এই কোচের শান্ত উপস্থিতি দলকে অভয় দেয়। আনচেলত্তির সেই শান্ত সমুদ্রেও এবার অশান্তির ঢেউ তুলেছে একটি নাম- নেইমার জুনিয়র। সাম্বা ফুটবলের এই বরপুত্রকে নিয়ে মহাবিপাকেই আছেন ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড। বিশ্বকাপের রণপরিকল্পনায় নেইমারকে রাজপুত্রের আসনে বসাবেন, নাকি তাকে ছাড়াই তরতরিয়ে এগিয়ে নেবেন রণতরী; সেই ধাঁধার উত্তর মিলছে না কিছুতেই। মাঠের ভেতরের রসায়ন আর বাইরের গুঞ্জনের চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে নেইমার এখন আনচেলত্তির শান্ত মগজের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে আনচেলত্তির রণপরিকল্পনায় যে নেইমার ছিলেন না, সেটা এখন দিনের আলোর মতো পরিস্কার। এমনকি দল ঘোষণার আগ পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত ছিল না, নেইমার আরেকটি বিশ্বকাপ খেলতে পারবেন কিনা। যতবারই প্রশ্ন করা হয়েছে, ততবারই নেইমারকে শতভাগ ফিট হয়ে ওঠার শর্ত জুড়ে দিয়েছেন আনচেলত্তি। কিন্তু ব্রাজিলের জনগণের প্রত্যাশার চাপেই হয়তো তিনি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আনফিট নেইমার চোট নিয়েই দলের সঙ্গে গেলেন বিশ্বকাপ খেলতে। কিন্তু ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতার পিছু ছাড়েনি চোট।
মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর হাইতির বিপক্ষে ম্যাচেও স্কোয়াডের বাইরে ছিলেন নেইমার। ড্র দিয়ে আসর শুরু করলেও দ্বিতীয় ম্যাচে বিধ্বংসী জয় পায় ব্রাজিল। জোড়া গোল করেন মাথেউস কুনিয়া। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে গোল পান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তবু নেইমারের ভুত পিছু ছাড়েনি আনচেলত্তির। ব্রাজিলিয়ান জাদুকরকে মাঠে দেখার তর সইছে না সমর্থকদের। তাই সংবাদ সম্মেলনে ঘুরেফিরেই আসে নেইমার প্রসঙ্গ। সাংবাদিকদের তির্যক প্রশ্নবাণের মুখে আনচেলত্তি প্রতিবার শান্ত মুখে দিয়ে যান এই চোটপ্রবণ তারকার প্রত্যাবর্তনের সবশেষ খবর।
হলুদ জার্সিতে সবুজ গালিচায় নেইমারের পায়ের জাদু অনেক দিন দেখা যায়নি। তবে মাঠে না নেমেও কীভাবে খবরের শিরোনামে থাকতে হয়, তা নেইমারের চেয়ে ভালো বোধহয় আর কেউ জানেন না! নিউ জার্সির বেসক্যাম্পে বসে যখন তিনি চোট থেকে সেরে ওঠার লড়াই করছেন, তখন তাকে নিয়ে উপহাস করেছেন খোদ ব্রাজিল প্রেসিডেন্ট লুলা দি সিলভা!
হাইতির বিপক্ষে খেলতে দলের সঙ্গে ফিলাডেলফিয়ায় না গিয়ে বেসক্যাম্পে তার থেকে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রোল শুরু হলে তা লুলা ডি সিলভার নজরে আসে। এরপরই রসিকতা করেন ব্রাজিল প্রেসিডেন্ট, ‘নেইমার তো খেলছেই না! আমি কোথাও একটা পড়লাম যে, ও নাকি বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড়, যাকে দলে ডাকা হয়েছে ‘রিমোট ওয়ার্ক’ বা দূর থেকে খেলার জন্য!’
অথচ এই লুলা ডি সিলভাই আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের পর হ্যাটট্রিকম্যান লিওনেল মেসিকে ব্রাজিল দলে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন! কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! ব্রাজিলের ফুটবলপাগল প্রেসিডেন্টই যেখানে নেইমারকে নিয়ে বিরক্ত, সেখানে ডাগ-আউটে বসে কার্লো আনচেলত্তির স্বস্তিতে থাকার কোনো কারণ আছে কি?
সব সমালোচনা ছাপিয়ে নেইমার মানেই সবুজ গালিচায় চোখ ধাঁধানো ড্রিবলিং আর অসামান্য মেধার বিস্ফোরণে প্রতিপক্ষের রক্ষণ চূর্ণ করে ছুটে চলা এক ফুটবল জাদুকর। কিন্তু বিধি বাম! চোটের অমোঘ নিয়তি বারবার থমকে দিয়েছে এই সাম্বা ফরোয়ার্ডের ছন্দময় ক্যারিয়ার। ‘ট্রান্সফারমার্কেট’-এর হিসাব বলছে, নেইমার তার ক্যারিয়ারের চোটের সংখ্যা চল্লিশ ছাড়িয়ে গেছে! বিশেষ করে বার্সেলোনা থেকে পিএসজিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরেই কাটিয়েছেন বেশি সময়।
চোটের এই অভিশাপ এতটাই তীব্র যে, গত তিনটি বছর জাতীয় দলের ঐতিহ্যবাহী জার্সিটাও গায়ে জড়াতে পারেননি। বিশ্বকাপ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখার আগেই ডান পায়ের কাফ মাসলের নতুন চোটে পড়েন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। সতীর্থরা যখন মাঠে লড়ছে, নেইমার লড়ছেন চোটের সঙ্গে। ক্লাব ফুটবলের সবকিছু জয় করে ফেলা আনচেলত্তির জন্য ‘চাপ’ শব্দটা নতুন কিছু নয়। ডাগ-আউটের এই ডন হয়তো চাপ অনুভবও করেন না। তবে এই মুহূর্তে তার মাথাব্যথার অন্যতম কারণ নেইমার। স্কটল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে এই ফরোয়ার্ড হয়তো বিশ্বকাপের মাঠে ফিরবেন, পায়ের জাদুতে সেলেসাওদের নিয়ে যাবেন অন্য উচ্চতায়; কিন্তু তাতে কি আনচেলত্তির স্বস্তি মিলবে? চোটপ্রবণ এই সুপারস্টার পরের ম্যাচেই যে আবার ছিটকে যাবেন না- তার গ্যারান্টিই বা কে দিতে পারে।




