সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা সামনে ইংল্যান্ড

২০১৮ সালের পর আনকোরা ও অনভিজ্ঞ লিওনেল স্কালোনি যখন আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নেন, আর্জেন্টাইন ফুটবলে উঠেছিল সমালোচনার ঝড়। ডিয়েগো ম্যারাডোনা থেকে শুরু করে অনেকেই তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। মিডিয়াও ছাড় দেয়নি।
সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলো নিশ্চয়ই সহজে ভুলে যাননি স্কালোনি। সে সময় মুখে এর জবাব দেননি। চেয়েছেন কাজেই সবার ভুল ভেঙে দিতে। সব সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ২০২১ কোপা আমেরিকা ও ২০২২ বিশ্বকাপে সাফল্যের মহাকাব্য লেখেন স্কালোনি। সবার অপছন্দের মানুষটিই ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সবার হৃদয়ে ঠাঁই পান, বনে যান দ্রোণাচার্য। আলবিসেলেস্তেদের নতুন ডাকনাম হয় ‘লা স্কালোনেতা’ বা স্কালোনির গাড়ি। সেই গাড়ি এই বিশ্বকাপেও ছুটছে একই গতিতে। গন্তব্যের খুব কাছে পৌঁছে গেছে তা। আর দুটি জয়ে সোনালি শিরোপা নিয়ে সেই গাড়িতে আবার হবে ভিক্টোরি ল্যাপ।
সুইজারল্যান্ডকে গেছে আর্জেন্টিনা। সব ভাবনা, সব কৌশল তার আবর্তিত লিওনেল মেসিকে ঘিরে। আবার অতিমাত্রায় মেসিনির্ভরতা কমিয়ে আনতেও দলের প্রত্যেক সদস্যকে গড়ে তুলেছেন অন্য ধাতুতে। যাতে কোনো ম্যাচে মেসি প্রতিপক্ষের গোলের দরজা খুঁজে না পেলেও অনাহূত বিপদ এসে হাজির না হয়।
সুইসদের হারানোর ম্যাচেই মিলেছে সে প্রমাণ। ১২০ মিনিট মেসি মাঠেই ছিলেন। ম্যাক আলিস্টারকে দিয়ে দশম মিনিটে গোলও করিয়েছেন। তবে আগের পাঁচ ম্যাচে আট গোলের মালিক এ ম্যাচে গোল পাননি। ছেদ পড়েছে টানা ৯ ম্যাচে গোলের ধারায়। জাদুকরের জাদুর বাক্স থেকে বের হয়নি গোলের জাদুকরী। তবে মেসির ছায়ায় প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হওয়া সতীর্থরা ঠিকই সময়মতো জ্বলে উঠেছেন। ম্যাক আলিস্টার, আলভারেস, লাউতারোর গোল পথ দেখিয়েছে স্কালোনেতা গাড়িকে।
রবিবার সকালে সুইস বাধা পেরিয়ে সেমিফাইনালে পা রাখার পর শিষ্যদের কঠিন পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার অভ্যস্ততার প্রশংসা করেন স্কালোনি। ৪৮ বছর বয়সী কোচের চোখে এই দলের প্রধান বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে আছে ডিএনএতে, ‘আমরা জানতাম আমাদের কষ্ট করতে হবে এবং এটা আমাদের রক্তে আছে, এটা আমাদের ডিএনএ’র অংশ। আর এটাই মনে শান্তি এনে দেয়।’
আপাতদৃষ্টে এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পথটা মসৃণ হওয়ার কথা ছিল। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান— এ তিন দলের বাধা পেরোতে সেভাবে কষ্ট হয়নি। তবে পরীক্ষার শুরু নকআউট পর্বে। শুরুতেই নবাগত কেপ ভার্দে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দেয় স্কালোনির দলকে। এরপর শেষ ষোলোতে মিসর আরও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে ম্যাচেও মেসি জ্বলেছেন স্বমহিমায়। গোল করা ও করানোর কাজটা দারুণভাবেই করেছেন। এরপর এলো সুইজারল্যান্ড পরীক্ষা। যেখানে মেসি দেখলেন তার জন্য সামর্থ্যের শেষটা উজাড় করে সতীর্থদের আরেকটি অনবদ্য চ্যালেঞ্জ জিতে নিতে।
এই নিবেদনই স্কালোনির বড় শক্তি, যা তাকে আরেকবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের গর্বিত কোচ হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফরাসিদের বিপক্ষে কঠিন মুহূর্তগুলো কাটিয়ে পাওয়া শিরোপাই শিষ্যদের মানসিকতা বদলে দিয়েছে— বিশ্বাস স্কালোনির, ‘কাতারে আমি বা আমরা ততটা অভিজ্ঞ ছিলাম না এবং সেই ধরনের পরিস্থিতিগুলো সামলানো খুব কঠিন ছিল। তবে এখন আমরা অনেক অভিজ্ঞ। জানি, প্রতিপক্ষের চাপ কী করে সামলাতে হয় বা সমতাসূচক গোল হজম করার অনুভূতি কেমন হয়। আমরা জানি সংযম কী করে ধরে রাখতে হয়। দল জানে কীভাবে শান্ত থেকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়। আমরা কখনোই হাল ছাড়ি না, ছাড়বও না।’
সুইসদের প্রশংসাও করেছেন স্কালোনি, ‘তারা কঠিন প্রতিপক্ষ ছিল। আমাদের জন্য ডুয়েলগুলো (দ্বৈরথ) জেতা এবং টানা পাঁচ-ছয়টির বেশি পাস খেলা খুব কঠিন ছিল। মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে ওয়ান-টু-ওয়ান লড়াইয়ে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল। আমাদের বেশ ভালোই ভুগতে হয়েছে।’ এরপরও স্কালোনেতা গাড়ি সেমিফাইনালের গন্তব্যে পৌঁছে গেছে।




