ইয়ামালের সাক্ষাৎকার
সেমিফাইনাল-ফাইনালে আমি বেশি ভালো খেলি

সংগৃহীত ছবি
এবারের বিশ্বকাপে স্পেনের সবচেয়ে বড় তারকা লামিন ইয়ামাল। তাকে ঘিরে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে স্পেন। বেলজিয়ামের মুখোমুখি হওয়ার আগে তিনি সাক্ষাৎকার দিলেন স্পেনের দৈনিক মুন্দো দেপোর্তিভোকে। তুলে ধরা হল এর চুম্বক অংশ।
প্রশ্ন: মাত্র ১৮ বছর বয়সেও অনেক পরিপক্ক আপনি।
লামিন ইয়ামাল: ফুটবল আর আমার ব্যক্তিগত জীবন-দুইখানেই যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সেটাই আমাকে পরিপক্ব করেছে, বড় হতে সাহায্য করেছে। আমার সতীর্থরাও প্রতিদিন সাহায্য করে। সিনিয়র ও অভিজ্ঞ মানুষদের সঙ্গে প্রতিদিনই কথা হয়, এসব কিছুই আমাকে সাহায্য করেছে।
প্রশ্ন: এই বিশ্বকাপে স্পেনের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করছে লামিন ইয়ামালের ওপর। রদ্রিও বলছিলেন, বড় ম্যাচগুলোতে প্রমাণ করবে আপনি কেন সেরা। সতীর্থদের এই আস্থাটা কীভাবে দেখছেন?
ইয়ামাল: আমি এটা উপভোগ করি। মানুষ আপনার ওপর ভরসা করছে এবং বিশ্বাস রাখছে-এটা বিশেষ কিছু। এটাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখি, কোনো চাপ নেই না বরং এটা আমাকে আনন্দই দেয়।
প্রশ্ন: এর তো নেতিবাচক দিকও আছে।
ইয়ামাল: এখানে দুটি পক্ষ আছে। একদল মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করে। অন্যদল আশা করে যেন আপনার দিনটি ভালো না যায়, যেন তারা আপনাকে কথা শোনানোর সুযোগ পায়। আসল বিষয় হলো শান্ত থাকা এবং আমরা যে পথে আছি সেই পথেই এগিয়ে যাওয়া। আমাদের লক্ষ্য শুধু জেতা, জেতা এবং জেতা। দিনশেষে কে কী বলল, তাতে কিছু যায় আসে না।
প্রশ্ন: সমালোচনা কি আপনার জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা ?
ইয়ামাল: আমি সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবেই নিই। কিছু দিন এমন যায় যখন মনে হয়, ‘ধুর, বুঝি না ওরা আমাকে এসব কেন বলছে।’ কিন্তু যেদিন আপনার সময় ভালো যাবে, সেদিন সবাইকে মুখ বন্ধ রাখতেই হবে।
প্রশ্ন: এই বিশ্বকাপ নিয়ে আপনার নিজের যে প্রত্যাশা ছিল, তা কি পূরণ হচ্ছে?
ইয়ামাল: বিশ্বাস করি আমি আরও ভালো করতে পারি। আমি নিজের ব্যাপারে খুবই খুঁতখুঁতে ও কঠোর। আমি এখন যা করছি, তাতে সন্তুষ্ট নই। আমি কখনোই বলি না, ‘ঠিক আছে, এটুকুই যথেষ্ট।’ বার্সায় থাকার সময়ও আমি কখনো আমার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি, তাই এখনো সন্তুষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই।
প্রশ্ন: কোথায় ঘাটতি আছে আপনার?
ইয়ামাল: আমি প্রায় দুই মাস মাঠের বাইরে ছিলাম। টানা সাত ম্যাচ খেলার পর যে ছন্দ থাকে, চোট থেকে ফেরার পর সেটা থাকে না। আমাকে বলের ছোঁয়া পেতে হবে, খেলা চালিয়ে যেতে হবে, মাঠে আরও বেশি সময় কাটাতে হবে এবং স্বাভাবিকভাবেই সেই দুর্দান্ত ম্যাচটিও চলে আসবে।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপের আসল পর্ব তো চলেই এলো; শিরোপা থেকে মাত্র তিনটি ম্যাচ দূরে আছেন?
ইয়ামাল: দিনশেষে মানুষ এই মুহূর্তগুলোই মনে রাখে-শেষ ষোলো এবং কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে শুরু করে পরের ম্যাচগুলো। নকআউটেই আমি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত থাকি। স্পেন দল হিসেবে কতটা ভালো, আর আমি নিজে কী করতে পারি সেটা দেখানোর জন্য মুখিয়ে আছি।
প্রশ্ন: কোচ সবসময় বলেন যে আপনাকে নিজের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। উনি আসলে কী বোঝাতে চান?
ইয়ামাল: কোচের মতো আপনাদেরও এমনটা মনে হতে পারে। সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচের পর মানুষ ভেবেছিল আমি গোল করতে না পারায় রেগে আছি। আমি সবসময় আমার বন্ধুদের বলি যে, গোল করতে পারিনি বলে আমি কখনো মাঠ থেকে রেগে বের হইনি। আমার লক্ষ্য শুধু গোল করা নয়, কারণ যেকোনো খেলোয়াড়ই গোল করতে পারে। আমি আরও বেশি কিছু চেয়েছিলাম। আমি আমার খেলার মান বাড়াতে চেয়েছিলাম, আরও বেশি কার্যকরী হতে চেয়েছিলাম। এটা শুধু একটা গোল করার ব্যাপার ছিল না। হয়তো মানুষ লক্ষ্য করে যে আমি গোল করার জন্য অনেক সুযোগ তৈরি করি, কিন্তু আসলে তা নয়। আমি এভাবেই খেলি, সবসময় এমনই ছিলাম। যারা বার্সায় আমার সব ম্যাচ দেখেছে তারা জানে যে আমি ওয়ান-টু-ওয়ান পরিস্থিতিতে ৬০ বার ড্রিবলিং করার চেষ্টা করি। আমার মনে হয় কোচ এই ধরনের অস্থিরতার কথাই বুঝিয়েছেন।
প্রশ্ন: পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচের পর কোচ দে লা ফুয়েন্তে আপনার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন, বিশেষ করে নু্নো মেন্দেসের বিপক্ষে রক্ষণভাগে আপনার কঠোর পরিশ্রমের কথা বলেছেন তিনি।
ইয়ামাল: ওটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচে। ওদের এমন একজন খেলোয়াড় ছিল যে আক্রমণ ও রক্ষণ দুইখানেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ওদের দলের অন্যতম প্রধান শক্তি। আমি আক্রমণ এবং রক্ষণ-দুই দিকেই দলকে যতটা সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করেছি।
প্রশ্ন: পর্তুগালের বিপক্ষে এই জয় দলের ওপর কেমন প্রভাব ফেলেছে?
ইয়ামাল: অনেক বড় প্রভাব ফেলেছে। এটা আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আমার কাছে পর্তুগাল এই বিশ্বকাপের সেরা তিনটি দলের একটি ছিল এবং ওদেরকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করতে পারাটা বেলজিয়াম ম্যাচের আগে আমাদের দারুণ আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। তবে আমরা জানি যে প্রতিটি ম্যাচই সম্পূর্ণ আলাদা এবং বিশ্বকাপে সবকিছুই খুব হাড্ডাহাড্ডি হয়।
প্রশ্ন: আবারও ‘লামিন মোমেন্ট’ (লামিনের সেই ম্যাজিক) প্রসঙ্গে ফিরছি। আমরা কি সেটা এখনই দেখতে পাব?
ইয়ামাল: হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো-যেমন সেমিফাইনাল বা ফাইনাল যত কাছে আসে, আমি তত ভালো খেলি। মানে কঠিন এই ম্যাচগুলোয় আমি ভালো খেলি। গ্রুপ পর্বে আমি কখনই সেরা খেলোয়াড় ছিলাম না, এটা নিয়ে আমি চিন্তিতও নই। আমি জানি এটা প্রমাণ করার সুযোগ আমার সামনে আসবে এবং আশা করি বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচটি পুরো দলের জন্যই একটি দুর্দান্ত ম্যাচ হবে।
প্রশ্ন: বেলজিয়ামকে হারাতে পারলে আপনাদের ফ্রান্স বা মরক্কোর মুখোমুখি হতে হতে পারে। দুটি দলই আপনার জন্য বিশেষ কিছু।
ইয়ামাল: হ্যাঁ, ফ্রান্সের সঙ্গে আমাদের ভালো স্মৃতি আছে, আর মরক্কোর বিপক্ষে খেলাটা আমার জন্য খুব বিশেষ কিছু হবে। ভালো ব্যাপার হলো এই দুটি দলই দুর্দান্ত এবং অত্যন্ত উচ্চমানের। যার মুখোমুখিই হই না কেন, আমরা জেতার এবং ফাইনালে পৌঁছানোর চেষ্টা করব।
প্রশ্ন: বেলজিয়ামের সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়টি গোলপোস্টের নিচে আছেন। কোর্তোয়ার জালে গোল করার অভিজ্ঞতা তো আপনার আগেই আছে।
ইয়ামাল: আমার মতে ও বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। সেটা আমার জন্য কাজটা আরও কঠিন করে তুলবে, তবে বরাবরের মতোই আমি মাঠে নামব জেতার মানসিকতা নিয়ে, কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের কথা মাথায় রেখে নয়।
প্রশ্ন: এই বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্স আপনার কেমন লাগছে?
ইয়ামাল: অবিশ্বাস্য! মেসি কে, তা সবাই জানে, তবে ও যে এই বয়সেও এত উচুঁ স্তরে খেলবে তা কেউ আশা করেনি। আমি ওর জন্য খুব খুশি। আমি নেইমার এবং ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর জন্যও আনন্দিত। এখন যারা খেলছে, তাদের সবার শৈশব গড়ে উঠেছে এই তারকাদের দেখে। ওদের ভালো কিছু হওয়া মানে তা আমার জন্যও ভালো লাগার বিষয়। আর আমি যদি ফাইনালে উঠি, তবে আমি কাপটা জিততেই চাইব।
প্রশ্ন: বার্সেলোনাতে হুলিয়ান আলভারেসকে নিয়ে অনেক গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। বার্সায় তার যোগ দেওয়াা নিয়ে কী ভাবছেন?
ইয়ামাল: সবাই জানে ও একজন বিশ্বমানের খেলোয়াড়, যাকে সব দলই নিজেদের স্কোয়াডে পেতে চাইবে। আমি আগেই বলেছি, আমরা ওকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। ও যদি আসে, আমরা সবাই খুশি হব। আমার মনে হয় বার্সার খেলার ধরণের সঙ্গে ও খুব ভালোভাবে মানিয়ে যাবে।




