বিশ্বকাপ
রোনালদোকে ছাড়াই কি বেশি শক্তিশালী পর্তুগাল?

সংগৃহীত ছবি
২০০৩ সালের ২০ আগস্ট। উত্তর পর্তুগালের শাভেস শহরের এক সাধারণ প্রীতি ম্যাচ। প্রতিপক্ষ কাজাখস্তান, মাঠের ঘাস এতটাই মলিন ছিল যে তা ঢাকতে রং করতে হয়েছিল! মাত্র ৮ হাজার দর্শকের সেই ম্যাচটি আজ ফুটবল ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারণ, সেদিনই পর্তুগাল জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর।
কেউ তখন ভাবেনি মেদেইরা থেকে আসা সেই ছেলেটি ২০২৬ সালে এসে নিজের ক্যারিয়ারের রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামবেন, যে কীর্তি এবার কেবল লিওনেল মেসি ও গুইলার্মো ওচোয়ারই রয়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৪৩ গোলের মালিক রোনালদো পর্তুগিজ ফুটবলকে বদলে দিয়েছেন, পুরো জাতির মানসিকতা পুনর্নির্মাণ করেছেন। কিন্তু ৪১ বছর বয়সে এসে আজ পর্তুগালেই এক বড় প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে— দল হিসেবে পর্তুগাল কি রোনালদোকে ছাড়াই বেশি শক্তিশালী?
একটা সময় পর্তুগালে রোনালদোর জায়গা নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে ‘দেশদ্রোহিতা’র শামিল মনে করা হতো। কিন্তু কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে সেই পরিস্থিতি বদলেছে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালকে তৃতীয় স্থান এনে দেওয়া দলের সদস্য আন্তোনিও সিমোয়েস যেমন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'সে জেতার জন্য খেলে না, সে খেলে ম্যাচের মূল আকর্ষণ হয়ে থাকার জন্য। আপনারা কি বোঝেন যে এটা ইউসেবিওর দর্শনের সম্পূর্ণ উল্টো? আমি বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারি না।'
একই সুর সিএনএন ও ডিএজেডএন পর্তুগালের ফুটবল বিশ্লেষক সোফিয়া অলিভেইরার কণ্ঠেও। তিনি বলেন, 'বিশ্বকাপ জিততে চায় এমন একটি দলের শুরুর একাদশে খেলার মতো ফুটবল এখন আর রোনালদোর পায়ে নেই। টুর্নামেন্টে এসে তাকে বেঞ্চে রাখার কথা বলা সহজ, কিন্তু জাতীয় দল তো তাকে ছাড়া খেলার কোনো প্রস্তুতিই নেয়নি।'
তবে এই বিতর্ককে স্রেফ ‘আড্ডাখানার গল্প’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন পর্তুগালের স্প্যানিশ কোচ রবার্তো মার্তিনেস। রোনালদোর পক্ষে যুক্তি দিয়ে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সেলেকাওদের হয়ে শেষ ৩১ ম্যাচে ২৫ গোল করেছেন এই আল-নাসর তারকা। মার্তিনেসের বক্তব্য, 'আমরা সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়কে নিয়ে কথা বলছি। সে এখানে তার অতীতের অর্জনের কারণে নেই, সে এখনো খুব উঁচু মানের পারফরম্যান্স করছে বলেই দলে আছে।'
সাবেক পর্তুগিজ গোলরক্ষক রিকার্দো, যিনি ২০০৩ সালে রোনালদোর অভিষেকের দিন মাঠে ছিলেন, বর্তমানে দলের কোচিং স্টাফের অংশ। রোনালদোর বর্তমান গতি নিয়ে তিনি মজা করে বলেন, 'গতির দিক থেকে আগে যেখানে সে ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াত, এখন হয়তো ১৯৫ কিলোমিটারে দৌড়ায়। কিন্তু এই বয়সে সেটাও অবিশ্বাস্য। তার শারীরিক ও মানসিক শক্তি এখনো প্রতিপক্ষের জন্য বিধ্বংসী।'এদিকে পরিসংখ্যান কিন্তু বিতর্কের পালে হাওয়া দিচ্ছে। মার্তিনেসের অধীনে ৩৯টি ম্যাচের মধ্যে রোনালদো খেলেছেন ৩১টিতে। চোট বা নিষেধাজ্ঞার কারণে রোনালদো যে ম্যাচগুলোতে ছিলেন না, তার মধ্যেই পর্তুগাল তাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় দুটি জয় পেয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে লুক্সেমবার্গের বিপক্ষে ৯-০ এবং গত নভেম্বরে আর্মেনিয়ার বিপক্ষে ৯-১ গোলের জয়। আর এই ম্যাচগুলোর পরই জাতীয় দলে রোনালদোর অপরিহার্যতা নিয়ে আলোচনা গতি পায়।
রোনালদোর এই আকাশচুম্বী প্রভাব মাঠের বাইরেও পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনকে (এফপিএফ) চাপে রাখে। ২০২২ বিশ্বকাপে রোনালদোকে বেঞ্চে বসানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন তৎকালীন কোচ ফের্নান্দো সান্তোস, যা পরে তার বিদায় ত্বরান্বিত করে। এমনকি সম্প্রতি এফপিএফ রোনালদোর মালিকানাধীন একটি ফিটনেস কোম্পানির সাথে অংশীদারিত্বের চুক্তি করায় স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নও উঠেছে, যদিও ফেডারেশন তা অস্বীকার করেছে।
পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসা অবশ্য রোনালদো-পরবর্তী যুগের প্রস্তুতি নিয়ে বলেন, 'ফেডারেশন বিষয়টি নিয়ে কোনো নাটক করছে না, বরং যথাযথ প্রস্তুতি নিচ্ছে। রোনালদো আজীবন পর্তুগাল ব্র্যান্ডের সাথে জড়িয়ে থাকবে। তবে তার বিদায়ের পরও স্বাভাবিক নিয়মেই ফেডারেশনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাকা সচল থাকবে।'
পর্তুগিজ ফুটবলের সমার্থক হয়ে ওঠা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছেন, এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ। আগামী ১৭ জুন ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে পর্তুগালের বিশ্বকাপ অভিযান। ইউসেবিওর ৯টি বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড ভাঙার চেয়েও রোনালদোর মূল লক্ষ্য থাকবে নিজের শেষ মঞ্চে পর্তুগালকে অধরা বিশ্বকাপ ট্রফি এনে দেওয়া।
-বিবিসি স্পোর্টস অবলম্বনে






