মেসি নন রোদ্রি

স্পেন অধিনায়ক রোদ্রিগো এর্নান্দেস কাসকান্তে
ফাইনালে আর্জেন্টিনা হেরেছে, তাই বলে লিওনেল মেসির অবদানও কি মুছে যাবে? নিজের ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্টে তিনি ফাইনালে তুলেছেন তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের! এটার পুরস্কার হতে পারত গোল্ডেন বল। এরকমই ভাবনা ছিল অনেকের। তাতে জল দিয়ে ফিফা রোদ্রির হাতে তুলে দিয়েছে ‘গোল্ডেন বল’-এর পুরস্কার।
প্রশ্নটা হলো— রোদ্রির হাতে কেন এ পুরস্কার? স্পেন অধিনায়কের এমন কোনো পারফরম্যান্স বিশেষভাবে চোখে পড়ছে না। তার নেই কোনো গোল, নেই একটি অ্যাসিস্টও! এরপরও কেন?
রোদ্রির খেলাটা হয়তো বিশেষভাবে ধরা পড়বে না সাধারণের চোখে। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা কোচ মারুফুল হকের ব্যাখ্যা, ‘সাধারণ দর্শকরা রোদ্রিকে মূল্যায়ন করতে পারবে না। ম্যাচে তিনি মাঝমাঠে যে কাজ করেন, তাতে স্পেনের বাকিরা ছবির মতো ফুটবল খেলতে পারেন। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে চাপে রাখার কাজটা করেন। ফাইনাল ম্যাচে দেখবেন আর্জেন্টিনার কারও পায়ে বল গেলেই ছিনিয়ে নিচ্ছেন তিনি। পারফরম্যান্সের পুরো পরিসংখ্যানটা দেখেই রোদ্রিকে দেওয়া হয়েছে এ পুরস্কার।’
গোল্ডেন বলের পুরস্কারটা দেওয়া হয় ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের বিশ্লেষণ-পরবর্তী ভোটের মাধ্যমে। পারফরম্যন্সের ডেটা নিয়ে প্রথমে স্টাডি গ্রুপ তৈরি করে শর্ট লিস্ট। তার ওপরই হয় ভোটিং। ফিফার এই টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের সদস্য আর্জেন্টাইন তারকা পাবলো জাবালেতার কণ্ঠেও স্পেনের এ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূয়সী প্রশংসা, ‘রোদ্রি দারুণভাবে ম্যাচ পড়তে পারে। কখন প্রেস করতে হবে, সেটা খুব ভালো জানে। কাউন্টার প্রেসিংয়ে তার অবস্থান এত নিখুঁত থাকে যে, সে দ্রুত বল পুনরুদ্ধার করতে পারে। বল হারালে প্রথম দুই-তিন সেকেন্ডের মধ্যেই প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয় আর সবসময় সে সঠিক জায়গায় থাকে।’
ফিফা স্টাডি গ্রুপের তাকে নির্বাচনের সারমর্ম হলো, স্পেনের খেলার মূল সুরটি তৈরি হয় রোদ্রির পায়ে। তাকে বলা যায় দলের রিমোট কন্ট্রোল। আটটি ম্যাচেই মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ, খেলার গতি বাড়ানো-কমানো এবং প্রতিপক্ষকে থামানো— সবকিছুতেই ছিলেন এ স্প্যানিশ মিডফিল্ডার। টুর্নামেন্টসেরার পুরস্কার জিতে রোদ্রিও যেন খানিকটা বিস্মিত, ‘এটা নিখুঁতভাবে লেখা কোনো চিত্রনাট্য। সত্যি বলতে, আমি কখনো এমন কিছু আশা করিনি।’ এরপর যোগ করেন, ‘আমি চাই নতুন প্রজন্ম দেখুক, একজন ফুটবলার আকাশ ছুঁয়ে আবার নরকে নেমে যেতে পারে। কিন্তু সেখান থেকেও ফিরে আসতে পারে। এটি বাধা জয় করার একটি শিক্ষা।’
২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী এ মিডফিল্ডারের ক্যারিয়াটা খুব সোজা পথে এগোয়নি। ২০২৪-এর সেপ্টেম্বেরে তার ক্যারিয়ারে অন্ধকার নেমে আসে ডান হাঁটুর এসিএল ইনজুরিতে। এটাকেই তিনি বলছেন নরক। এমন চোট অনেক তারকাকে শেষ করে দেয়। তারা ফিরে পান না আগের ঔজ্জ্বল্য। মাঠের বাইরে কাটে ১৫ মাস। সেরা রোদ্রিকে না পাওয়ার শঙ্কা তৈরি হলেও একমাত্র ম্যানসিটি কোচ পেপ গার্দিওলাই বিশ্বাস রেখেছিলেন, ‘বিশ্বকাপেই সেরা রোদ্রিকে দেখা যাবে।’ বিশ্বকাপের আগে ক্লাব ফুটবলেও তাকে স্বরূপে দেখা যায়নি।
কিন্তু তার ধাপে ধাপে পুনর্বাসন, কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য মানসিক শক্তিই তাকে বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরিয়ে আনে। মিডফিল্ডে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু পাস বিলি করেননি, যেন অদৃশ্য এক সুরকারের মতো পুরো ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
কখন খেলার গতি বাড়াতে হবে, কখন কমাতে হবে সবকিছুই যেন তার পায়ে স্পর্শে পরিচালিত হয়েছে। বিশ্বকাপের এক আসরে ৭৫৬টির বেশি সফল পাস খেলার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ছন্দহীন করা থেকে শুরু করে ফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনাকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া— সবখানেই ছিল রোদ্রির প্রভাব।




