মেসি মহাকাব্য
জাদুকরীর শেষ দৃশ্য

লিওনেল মেসি
আকাশছোঁয়া ভবন বেয়ে স্পাইডারম্যানের ঝুলে থাকা, কিংবা ম্যানহাটনকে রক্ষা করতে অ্যাভেঞ্জার্সদের লড়াই— নিউ ইয়র্কের দিকে তাকালে ব্যাটম্যান বা সুপারম্যানের কথা মনে না পড়ে উপায় নেই। লিওনেল মেসিও ফুটবলের সুপারহিরো। এই ৩৯ বছর বয়সে অকল্পনীয় সব কীর্তি করে চলেছেন অবলীলায়। আজ ফাইনালে নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সিতে সেই সুপারহিরোর মায়া দেখতে মুখিয়ে পুরো বিশ্ব। বিশ্বকাপে মেসির ‘শেষ জাদু’র জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো শহর হতেই পারত না।
পেলে তিন-তিনটি বিশ্বকাপ জিতলেও ১৯৬২ সালের ফাইনাল খেলেননি। একমাত্র ফুটবলার হিসেবে তিনটি ফাইনাল খেলার রেকর্ড ছিল শুধুই ব্রাজিলের কাফুর। আজ তার পাশে নাম লেখাতে চলেছেন মেসি। আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তির প্রভাব এতটাই যে, ফাইনালের আগের সংবাদ সম্মেলনে খোদ স্পেনের অধিনায়ক রোদ্রির মুগ্ধতা, ‘একজন খেলোয়াড় হিসেবে মেসি কী এবং আর্জেন্টিনার জন্য তার অর্থ কী, সেটি ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আমার চোখে মেসিই সর্বকালের সেরা।’
মেসি আজ শুধু বিশ্বকাপ ফাইনালই খেলতে নামছেন না, তিনি ফিরে যাচ্ছেন সেই স্টেডিয়ামে, যেখানে ঠিক ১০ বছর আগে ভেবেছিলেন আর্জেন্টিনার সঙ্গে তার রূপকথা শেষ। ২০১৬ কোপার ফাইনালে চিলির কাছে হেরে আর পেনাল্টি মিস করার পর বলেছিলেন, ‘জাতীয় দলের সঙ্গে আমার পথচলা এখানেই শেষ।’ সেটা ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে তার চতুর্থ ফাইনাল হার। এর দুই বছর আগে হেরেছিলেন বিশ্বকাপ ফাইনালেও। মেটলাইফ স্টেডিয়াম থেকে মেসি যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন নিশ্চিত ছিলেন, কিছু গল্পের শেষটা বোধহয় সুন্দর হয় না।
মেসি ফিরে এসেছেন তারপরও। আর ফিরেছিলেন বলেই ৩৯ বছর বয়সে একজন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তিনি আবার সেই মেটলাইফে ফিরছেন তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে। তা-ও স্পেনের বিপক্ষে, যে দেশে ফুটবলার আর সর্বকালের অন্যতম সেরা হয়ে ওঠা। তবে স্পেন এমন এক জাতীয় দল, যারা একসময় মেসিকে নিজেদের করে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। বছরের পর বছর ধরে সেই নিষ্ঠুর ধারণাটিকে উসকে দিয়েছিল— মেসি নাকি ভুল দল বেছে নিয়েছেন! স্পেনের হয়ে খেললে তিনি ২০১০ সালেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারতেন।
মেসি সহজ পথটা বেছে না নিয়ে খেলেছেন জন্মভূমি আর্জেন্টিনার হয়ে। তাই এই ‘শেষটা’ যেন তার জন্যই লেখা! এই ম্যাচটি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক পরাজয়ের মঞ্চে আর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে সেই দেশ— যা তার বেছে না নেওয়া সেই বিকল্প জীবনের প্রতীক।
নিউ ইয়র্ক শেখায়, সুপারহিরো মানে এই নয় যে, তারা কখনো হারে না। বরং সুপারহিরো তারাই, যারা সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পরও শেষ একটি লড়াইয়ের জন্য আবার উঠে দাঁড়ায়। মেসি এই স্টেডিয়ামে আগেও হেরেছেন আর বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন তিনি আর পারবেন না। সেই তিনি আবার ফিরেছেন। জিতেছেন দুটি কোপা, একটি বিশ্বকাপ ও ফিনালেসিমা। এমনিতেই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ জিতেছেন দুবার। তৃতীয়বারের মতো এটি জেতা হয়তো সময়ের অপেক্ষা তার। এমনকি ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে জিততে পারেন গোল্ডেন বুটও। এই বিশ্বকাপে তার গোল ৮ আর অ্যাসিস্ট ৪টি। এখন সুপারহিরোদের এই শহরে শুধু শেষ দৃশ্যটুকু বাকি।
সব দুর্দান্ত সিনেমাতেই এমন একটি মুহূর্ত থাকে, যখন নায়ক তার পরাজয়ের পুরনো জায়গায় ফিরে আসে। আর শেষটা হয় মধুর। মেসির বিশ্বকাপের গল্পটাও এখন মধুর সমাপ্তির অপেক্ষায়।




